০৮:৫০ পি.এম
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের শাসনের গত ১২ বছরে দেশের গণতন্ত্র, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের জনগণ এখন এই ক্ষতির বিষয়টি উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন এবং তাদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৭৯ বছর বয়সি সোনিয়া গান্ধী সম্প্রতি দ্য হিন্দু ইন্টারভিউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি জানান, আগামী ১০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার স্মৃতিকথা বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ।
সাক্ষাৎকারে ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের একসময়কার একচ্ছত্র আধিপত্য কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি জানান যে তিনি এ নিয়ে খুব বেশি হতাশ নন।
আরও পড়ুন: গাজায় ভারী বৃষ্টিতে প্লাবিত ফিলিস্তিনিদের তাঁবু, শীতে কাঁপছে শিশুরা
সোনিয়া বলেন, ‘গত ১২ বছরে আমাদের দেশ, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও বড় ধরনের প্রচেষ্টা প্রয়োজন।’
তিনি আরও মন্তব্য করেন, ‘মানুষ এখন অসন্তুষ্ট হতে শুরু করেছে এবং ক্ষতির বিষয়টি বুঝতে পারছে। তবে আমি আশাবাদী। আমার বিশ্বাস, দেশের মানুষ আবারও সুশাসন ফিরে আসাকে স্বাগত জানাবে।’
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারতের রাজনীতি আবার নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনাভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে কংগ্রেস। দলটির অভিযোগ, নির্বাচনে ভোট চুরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে তারা।
আরও পড়ুন: প্রথম বিদেশি নভোচারী হিসেবে চীনের মহাকাশ স্টেশনে যাচ্ছেন পাকিস্তানের নাগরিক
এ ছাড়া জুলাই মাসে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
সোনিয়ার বক্তব্যের জবাব বিজেপির
সোনিয়া গান্ধীর গণতন্ত্র নিয়ে মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল। তিনি কংগ্রেস নেত্রীকে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
মেঘওয়াল বলেন, ‘সাক্ষাৎকারে গণতন্ত্র নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন সোনিয়াজি। আমি তাকে প্রশ্ন করতে চাই, ১৯৭৫ সালের কথা কি তার মনে নেই? তখন গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাজারো জ্যেষ্ঠ নেতাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। সাংবাদিকদের কণ্ঠও রোধ করা হয়েছিল। সেই সময়ের কথাও তার মনে রাখা উচিত।’
আরও পড়ুন: আরব উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলায় এক নাবিক নিহত
তিনি আরও বলেন, গত ১২ বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করেছেন। তার নেতৃত্বেই ভারত বিশ্বজুড়ে ‘গণতন্ত্রের জননী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বলে দাবি করেন এই মন্ত্রী।
কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংও সোনিয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ভারতের নয়টি রাজ্যে গত ৪০ বছর ধরে কংগ্রেস ক্ষমতায় নেই। তার দাবি, এই সেই কংগ্রেস, যারা একসময় জরুরি অবস্থা জারি করে জনগণের কণ্ঠ রোধ করেছিল।
জরুরি অবস্থা নিয়ে যা বললেন সোনিয়া
সাক্ষাৎকারে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার পটভূমি নিয়েও কথা বলেন সোনিয়া গান্ধী। তিনি বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
আরও পড়ুন: নোয়াখালী-চট্টগ্রাম-সিলেট দখলের উসকানি বিজেপি এমপির
সোনিয়ার ভাষায়, সে সময় বিভিন্ন স্থানে সহিংস বিক্ষোভ চলছিল। সরকারি কার্যালয় ও গণপরিবহনে আগুন দেওয়া হচ্ছিল। ব্যাপক বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ অমান্য করার আহ্বানও জানানো হচ্ছিল।
তবে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই না গেয়ে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এ পরিস্থিতির সমাধান হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘পেছন ফিরে তাকালে আমরা বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। ভুলে গেলে চলবে না, ইন্দিরা গান্ধী নিজেই পরিস্থিতি উপলব্ধি করেছিলেন এবং ১৯৭৭ সালের মার্চে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে জরুরি অবস্থার সময় অতিরিক্ত কঠোরতার জন্য তিনি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছিলেন।’
সোনিয়া স্বীকার করেন, রাজনীতিতে কখনো কখনো সমঝোতা করতে হয়। তবে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে তার দল কখনো কোনো সমঝোতা করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন: পারমাণবিক আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ৭ কড়া শর্ত
নির্বাচনে সমান সুযোগ পাচ্ছে না বিরোধীরা: সোনিয়া
২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪ সালের পরপর তিনটি লোকসভা নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর কংগ্রেস এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দলটির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের ভেতরেও এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ১০ মাসে ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এই প্রতিবেদনকে সামনে রেখে কংগ্রেসের দাবি, দেশে অনেক নির্বাচনেই কারচুপি হয়েছে। এ কারণে দলটি আবার ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ইরান সংকটে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বড় পতন
সোনিয়া গান্ধীর অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে সমান সুযোগ পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘আমি খুব বেশি হতাশ নই। কারণ, এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো সমান সুযোগ পায়নি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, মূলধারার গণমাধ্যম, বিপুল অর্থের ব্যবহার এবং ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।’
তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কংগ্রেস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সোনিয়া বলেন, ‘এত চাপের মধ্যেও টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে একমাত্র কংগ্রেস। আমাদের নেতা-কর্মীরা অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। নানা ধরনের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েও দেশের প্রতিটি গ্রাম ও জেলায় কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা সংবিধানে উল্লেখিত মূল্যবোধ রক্ষায় লড়াই করছেন।’
তিনি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক নির্বাচনে কারচুপির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে এবং মানুষ এখন এ বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন।
সোনিয়া জানান, কংগ্রেস একই মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করছে এবং দিন দিন দলটির নির্বাচনী সম্ভাবনা বাড়ছে।
মোদির রাজনৈতিক উত্থান নিয়েও মন্তব্য
সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থান নিয়েও কথা বলেন সোনিয়া গান্ধী।
মোদির চা বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গল্প তার প্রচার দল কিছুটা বাড়িয়ে প্রচার করেছে কিনা, এমন প্রশ্নে সোনিয়া বলেন, আরএসএসের ভেতরে একজন সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে উঠে এসে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর জন্য মোদিকে অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এটা সত্য যে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আদর্শিক পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন। তবে রাজনীতিতে সফল হওয়ার অনেক পথ রয়েছে। কংগ্রেসের মধ্যেও এমন উদাহরণ আছে। যেমন—ড. মনমোহন সিং ও কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। আরএসএসের কাছ থেকে আমাদের শেখার মতো তেমন কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।’
সূত্র: এনডিটিভি
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন