০৯:১২ পি.এম
উৎসবের আয়োজনের সময় বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়। আগের রাতেই রান্না করা ডাল ও ভাত, বড় পাত্রে রাখা পনিরের ঝোল দীর্ঘ সময় ঠান্ডা হয়ে যায় এবং দুধের মিষ্টি খোলা বাক্সে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া হয়। অতিথিদের আগমন ও বুফেতে সাজানো খাবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে পড়ে থাকার কারণে খাবারে ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অনেকেই উৎসবের খাবার খেয়ে পেট খারাপ হওয়াকে আনন্দ-উৎসবের স্বাভাবিক ফল বলে মনে করেন। সাধারণত এক থেকে দুই দিনের মধ্যে সমস্যা সেরে যায়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে একই দিন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
খাবার খাওয়ার পর কত সময়ের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, তা থেকে সমস্যার কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। খাবার খাওয়ার এক থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে সাধারণত খাবারে আগে থেকেই তৈরি হয়ে থাকা বিষাক্ত পদার্থ এর কারণ হতে পারে। হাত দিয়ে খাবার পরিবেশন করে ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিলে স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস ব্যাকটেরিয়া বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় গরম অবস্থায় রাখা ভাতে ব্যাসিলাস সেরিয়াস ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করতে পারে। এই অবস্থায় হঠাৎ বমি ও পেটে মোচড় শুরু হয়, তবে সাধারণত এক দিনের মধ্যেই উপসর্গ কমে আসে।
আরও পড়ুন: শীতে সুস্থ থাকতে খাবারের মেনুতে রাখুন ৬ উপাদান
অন্যদিকে, খাবার খাওয়ার আট থেকে ৭২ ঘণ্টা পর অসুস্থতা শুরু হলে এর পেছনে সালমোনেলা, শিগেলা, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর বা ক্ষতিকর ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া দায়ী হতে পারে। এসব জীবাণু অন্ত্রে বংশবিস্তার করে এবং ফলে জ্বর, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া এবং পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা যাবে না
পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া কিংবা কালো, আলকাতরার মতো পায়খানা হওয়া গুরুতর লক্ষণ। এর অর্থ হতে পারে, সংক্রমণকারী জীবাণু অন্ত্রের ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ডায়রিয়ার সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি (১০১.৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট) হলেও সতর্ক হতে হবে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে একই দিন চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মল পরীক্ষা করানো জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আগে লোপেরামাইড বা এ ধরনের ডায়রিয়া বন্ধের ওষুধ না খাওয়াই ভালো। কারণ, এসব ওষুধ অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচল কমিয়ে দেয়। এতে সংক্রমণকারী জীবাণু অন্ত্রে দীর্ঘ সময় থেকে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: ঘুমিয়ে ১৩ লাখ টাকা জিতলেন জিনিয়া চ্যাটার্জি
পানিশূন্যতা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট জটিলতার বড় একটি অংশের জন্য দায়ী পানিশূন্যতা। প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া, দিনে তিনবারের কম প্রস্রাব হওয়া, জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, দাঁড়ালে মাথা ঘোরা, নাড়ির গতি বেড়ে যাওয়া এবং চোখ বসে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ছয় ঘণ্টা ধরে ওরস্যালাইন খাওয়ার পরও প্রতিবার বমি হয়ে গেলে শরীরে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণার অনুভূতি কম হতে পারে। তাই তাদের অসুস্থতার সামান্য লক্ষণ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর এক গ্লাস করে ওরস্যালাইন অল্প অল্প করে পান করলে শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। শুধু পানি, চা কিংবা কোমল পানীয় শরীরের পানির ঘাটতি কিছুটা পূরণ করলেও ওরস্যালাইনের মতো সোডিয়াম ও গ্লুকোজের সমন্বয় থাকে না। অথচ এই দুই উপাদান অন্ত্রে পানি শোষণে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন: প্রতিদিন একই খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরে যেসব প্রভাব ফেলতে পারে
স্নায়বিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন
স্নায়বিক জটিলতা তুলনামূলক বিরল হলেও সবচেয়ে বিপজ্জনক। বাড়িতে কৌটাজাত বা সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা খাবার, কিছু বিষাক্ত মাশরুম কিংবা সামুদ্রিক খাবারের বিষক্রিয়া থেকে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।
চোখে ঝাপসা বা দুটি করে দেখা, চোখের পাতা ঝুলে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, খাবার গিলতে অসুবিধা এবং হাত-পায়ে ধীরে ধীরে দুর্বলতা ছড়িয়ে পড়া—এসব লক্ষণ বটুলিনাম টক্সিনের বিষক্রিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। খাবার খাওয়ার পর মুখের চারপাশে ঝিনঝিন অনুভূতি হলেও সতর্ক হতে হবে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
পেটব্যথার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ
আরও পড়ুন: ঘুমিয়েও যেভাবে অনেকে সতেজ থাকেন
খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে সাধারণত পেটে ঢেউয়ের মতো মোচড় বা ব্যথা হয়, যা কিছুক্ষণ পর কমে আসে। কিন্তু ব্যথা যদি একটানা থাকে, পেটের নির্দিষ্ট কোনো জায়গায়—বিশেষ করে ডান দিকের নিচের অংশে—অনুভূত হয় কিংবা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে, তাহলে তা অ্যাপেন্ডিসাইটিস বা অন্ত্রে ছিদ্র হওয়ার মতো গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। পেট শক্ত হয়ে যাওয়া এবং স্পর্শ করলে তীব্র ব্যথা অনুভূত হলেও দ্রুত সার্জারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।
২৪ ঘণ্টার বেশি বমি, তিন দিনের বেশি ডায়রিয়া কিংবা দ্বিতীয় দিনেও জ্বর বাড়তে থাকলে সংক্রমণের কারণ শনাক্ত করতে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকও লাগতে পারে।
রক্তমিশ্রিত ডায়রিয়ার কয়েক দিন পর প্রস্রাবের পরিমাণ খুব কমে যাওয়া, শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া কিংবা মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা হেমোলাইটিক ইউরেমিক সিনড্রোমের ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার নির্দিষ্ট কিছু ধরনের সংক্রমণের পর কিডনির এই জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের বাড়তি সতর্কতা
আরও পড়ুন: পর্যাপ্ত ঘুমের পরও ক্লান্তি কাটছে না? সমস্যায় ভুগছেন আর্থ্রাইটিসের কারণে
ডায়রিয়া ও বমির কারণে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে গেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এমনকি ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস বা হাইপারঅসমোলার অবস্থার মতো গুরুতর জটিলতাও তৈরি হতে পারে। আবার অসুস্থতার কারণে খাবার কম খেয়েও ইনসুলিন বা সালফোনাইলইউরিয়া জাতীয় ওষুধ চালিয়ে গেলে রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া কিছু প্রচলিত ওষুধ পানিশূন্যতার সময় ঝুঁকি বাড়ায়। মেটফরমিন গ্রহণে ল্যাকটিক অ্যাসিডোসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমপাগ্লিফ্লোজিন ও ডাপাগ্লিফ্লোজিনের মতো এসজিএলটি-২ ইনহিবিটর রক্তে শর্করার মাত্রা প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও কিটোঅ্যাসিডোসিস ঘটাতে পারে।
অন্যদিকে, এসিই ইনহিবিটর, এআরবি, মূত্রবর্ধক ওষুধ এবং ডাইক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক পানিশূন্যতার সময় কিডনির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা অনেক সময় সাময়িকভাবে কিছু ওষুধ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। তবে নিজে থেকে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। অসুস্থতার প্রথম দিনেই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো।
আরও পড়ুন: দাড়ি ছেঁটে গোঁফে মামদানি, স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা
এ সময় প্রতি চার ঘণ্টা পরপর রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা, শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে কিটোন পরীক্ষা করা এবং মুখে ফলের মতো গন্ধ, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস কিংবা বমিভাব অব্যাহত থাকলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। সাধারণত বেসাল ইনসুলিন চালিয়ে যেতে হয়, তবে এর মাত্রা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু, কিডনি বা লিভারের রোগী এবং স্টেরয়েড কিংবা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমায় এমন ওষুধ গ্রহণকারীদের সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গর্ভাবস্থায় অপাস্তুরিত দুধ ও নরম পনিরে থাকা লিস্টেরিয়া ব্যাকটেরিয়া গর্ভস্থ শিশুর শরীরেও পৌঁছাতে পারে। তাই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জ্বর দেখা দিলেও একই দিন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন