০৬:৫৮ পি.এম
সারা দিনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তির পর যখন সন্ধ্যা আসে, তখন শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। ঠিক তেমনি, ভোরের আলো নতুন দিনের সোনালী সূচনা করে। মুমিনের জীবনে সকাল ও সন্ধ্যার নির্দিষ্ট কিছু জিকির ও দোয়া আত্মিক প্রশান্তি অর্জনের পাশাপাশি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সুরক্ষা প্রদান করে।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সকাল ও সন্ধ্যায় কিছু বিশেষ জিকির ও দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা পাঠ করলে সারা দিনের নিরাপত্তা ও বরকত লাভ হয় এবং আখিরাতের কঠিন সময়েও মুক্তির মাধ্যম হবে। মাগরিবের নামাজের পর এবং ফজর পরবর্তী সময়ে বরকতময় এসব আমলের মাধ্যমে একজন মুমিন তার দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন সুরক্ষিত করতে সক্ষম হন। সকাল সন্ধ্যার তেমন কিছু জিকির ও আমল নিচে উল্লেখ করা হলো—
১. সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দোয়া)
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় ৫০০ শিক্ষার্থীর মাঝে খুদ্দামুল কুরআনের কুরআন বিতরণ
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা আন্তা রব্বি লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা, খালাকতানি ওয়া আনা আব্দুকা, ওয়া আনা আলা আহ্দিকা, ওয়া ওয়া’দিকা মাসতাতাতু, আউজুবিকা মিন শাররি মা সানাতু, আবুউ লাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়্যা, ওয়া আবুউ বিজাম্বি, ফাগফিরলি; ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আন্তা।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনারই বান্দা। আমি আমার সাধ্যানুযায়ী আপনার সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ওপর কায়েম আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। আপনার যে নিয়ামত রয়েছে, তা আমি স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। অতএব, আমাকে ক্ষমা করে দিন। কেননা, আপনি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।’
ফজিলত
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ সফরে আসছেন প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার মাওলানা মাহমুদ মাদানি
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকালে বা সন্ধ্যায় এই সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পাঠ করবে এবং ওই দিন বা রাতে তার ইন্তেকাল হয়, তবে সে জান্নাত লাভ করবে।’ (বুখারি ৬৩০৬)
২. সকল অনিষ্ট থেকে বাঁচার দোয়া
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস্সামাই ওয়া হুয়াসসামিউল আলিম।’
আরও পড়ুন: কোরআনে জাকাতকে ‘সাদাকাহ’ বলা হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা
অর্থ: ‘আল্লাহর নামে, যার নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।’
ফজিলত
সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার এই দোয়াটি পাঠ করলে আসমান ও জমিনের কোনো অনিষ্ট বা বিপদ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। (আবু দাউদ ৫০৭২)
৩. সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির: তাসবিহ পাঠ
আরও পড়ুন: আজকের নামাজের সময়সূচি: ৭ নভেম্বর ২০২৬
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ
উচ্চারণ: ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।’
অর্থ: ‘আল্লাহ পবিত্র এবং সকল প্রশংসা কেবল তারই।’
ফজিলত
আরও পড়ুন: ফ্রিতে ওমরাহ পালনের সুযোগ, কুইজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আবেদন করুন
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি এই জিকির সকালে ও সন্ধ্যায় ১০০ বার পড়বে, কিয়ামতের দিন তার চেয়ে উত্তম আমল আর কেউ আনতে পারবে না।’ (মুসলিম ২৬৯২)
৪. আয়াতুল কুরসি পাঠ
اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهُ ما فِي السَّمَاوَاتِ وَما فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ ما بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَما خَلْفَهُمْ وَلا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম, লা তাখুযুহু সিনাতুউ ওয়ালা নাওম, লাহু মা ফিসসামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ, মান জাল্লাজি ইয়াশফাউ ইংদাহু ইল্লা বিইজনিহি, ইয়ালামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়া মা খালফাহুম, ওয়া লা ইউহিতুনা বিশাইয়িম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শাআ, ওয়াসিআ কুরসিইয়ুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়া লা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা, ওয়া হুওয়াল আলিয়্যুল আজিম।’
আরও পড়ুন: নারীর নিরাপত্তায় পুরুষ বডিগার্ড: ইসলাম কী নির্দেশনা দেয়?
অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক। তাকে কোনো তন্দ্রা বা ঘুম স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সব তাঁরই মালিকানাধীন। তার অনুমতি ছাড়া তার কাছে সুপারিশ করার কেউ নেই। তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে, তা তিনি ভালোভাবেই জানেন। আর তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন, ততটুকু ছাড়া তার জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তার কুরসি আসমান ও জমিনময় পরিব্যাপ্ত। সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি সুমহান ও সর্বশ্রেষ্ঠ।
ফজিলত
প্রতি ফরজ নামাজের পর এবং সকাল ও সন্ধ্যায় আয়াতুল কুরসি পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। এটি পাঠকারীকে জান্নাতে যাওয়ার পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকে না এবং এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষা দেয়। (নাসাঈ ৯৯২৮, ইবনে হিব্বান ২০২৪)
৫. আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার বিশেষ দোয়া
رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا
উচ্চারণ: ‘রাদিতু বিল্লাহি রব্বাও ওয়া বিল ইসলামি দিনাও, ওয়া বি-মুহাম্মাদিন নাবিয়্যান।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ (সা.)-কে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।’
ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা তিনবার এই দোয়া পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে সন্তুষ্ট করবেন।’ (তিরমিজি ৩৩৮৯, ইবনে মাজাহ ৩৮৭০)
৬. জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া
اللَّهُمَّ أَجِرْنِي مِنَ النَّارِ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করুন।’
ফজিলত
হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ফজর ও মাগরিবের পর কারও সঙ্গে কথাবার্তা না বলে সাতবার এই দোয়াটি পাঠ করে এবং ওই দিনে বা রাতে তার মৃত্যু হয়, তবে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে।’ (আবু দাউদ ৫০৭৯)
৭. সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ
সকাল ও সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস—প্রতিটি তিনবার করে পাঠ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সকাল-সন্ধ্যা এই সুরাগুলো তিনবার পাঠ করলে সকল প্রকার অনিষ্টতা ও বিপদাপদ থেকে হেফাজতের জন্য তা যথেষ্ট হবে।’ (তিরমিজি ৩৫৭৫, আবু দাউদ ৫০৮২)
৮. সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত
هُوَ اللّٰهُ الَّذِیۡ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۚ اَلۡمَلِكُ الۡقُدُّوۡسُ السَّلٰمُ الۡمُؤۡمِنُ الۡمُهَیۡمِنُ الۡعَزِیۡزُ الۡجَبَّارُ الۡمُتَكَبِّرُ ؕ سُبۡحٰنَ اللّٰهِ عَمَّا یُشۡرِكُوۡنَ هُوَ اللّٰهُ الۡخَالِقُ الۡبَارِئُ الۡمُصَوِّرُ لَهُ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی ؕ یُسَبِّحُ لَهٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ وَ هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَكِیۡمُ
উচ্চারণ: হুয়াল্লাহুল্লাজি লা ইলাহা ইল্লাহ হুয়া। আল মালিকুল কুদ্দুসুস সালামুল মু’মিনুল মুহাইমিনুল আযিজুল ঝাব্বারুল মুতাকাব্বির, সুবহানাল্লাহি আম্মা ইউশরিকুনা হওয়াল্লাহুল কালিকুল বারিউল মুসাওয়িরু লাহুল আসমাউল হুসনা। ইউসাব্বিহু লাহু মা ফিস সামাওয়অতি ওয়াল আরদি ওয়া হুয়াল আযিজুল হাকিম।
অর্থ: ‘তিনিই আল্লাহ; যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনিই বাদশাহ, মহাপবিত্র, ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, রক্ষক, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত, তারা যা শরিক করে তা হতে পবিত্র মহান। তিনিই আল্লাহ, স্রষ্টা, উদ্ভাবনকর্তা, আকৃতিদানকারী; তার রয়েছে সুন্দর নামসমূহ; আসমান ও জমিনে যা আছে সবই তার মহিমা ঘোষণা করে। তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
আমল: মাগরিবের পর ‘আউজুবিল্লাহিস সামিয়িল আলিমি মিনাশ শাইতানির রজিম’ তিনবার পড়ে সুরা হাশরের শেষ তিন আয়াত একবার পাঠ করা।
ফজিলত
হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি এই আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য ৭০ হাজার রহমতের ফেরেশতা নিযুক্ত করবেন, যারা সকাল পর্যন্ত তার জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকবে। সেদিন রাতে মারা গেলে শহীদের মৃত্যু নসিব হবে।’ (তিরমিজি ২৯২২)
সন্ধ্যা ও সকাল হলো ইবাদত ও আত্মিক প্রশান্তির এক অপূর্ব সময়। সারা দিনের ক্লান্তি পেরিয়ে এই বরকতময় সময়গুলোতে উপরোক্ত জিকির ও দোয়াগুলো নিয়মিত আমলে রাখার মাধ্যমে একজন মুমিন তার দুনিয়া ও আখিরাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মাসনুন আমলগুলো নিয়মিত করার এবং এর বরকত হাসিল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন