০৭:০০ পি.এম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বর্তমানে কোটি কোটি মানুষের কাছে তথ্য ও খবর পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এসব প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম নির্ধারণ করে কোন পোস্টগুলো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং কোনগুলো কম দৃশ্যমান হবে। তাছাড়া, কনটেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের নীতিমালা প্রয়োগ করে থাকে, যা কোন ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করা যাবে এবং কোনটি যাবে না, তা নির্ধারণ করে।
তবে, এসব প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের প্রকাশ করা কনটেন্টের আইনি দায়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেকটাই দায়মুক্তি প্রদান করা হয়। এই আইনি সুবিধার কারণে মেটা, গুগল ও এক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশাল ব্যবসা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ভারতে বর্তমানে এই সুবিধা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ও এক্সের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ব্যবহারকারীদের প্রকাশ করা কনটেন্টের জন্য যে আইনি সুরক্ষা পায়, তা বজায় রাখা হবে কিনা, সে বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে। আলোচনাগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে, এর মাধ্যমে ভারতে ইন্টারনেট পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিধান নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তান ভেঙে ১২টি প্রদেশ হচ্ছে?
এ ক্ষেত্রে মূল আলোচনার বিষয় হলো ‘সেফ হারবার’ বা আইনি দায়মুক্তির নীতি। এই নীতির আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে ব্যবহারকারীদের প্রকাশ করা বিপুল পরিমাণ পোস্ট, ভিডিও ও মন্তব্যের জন্য সরাসরি প্রকাশকের মতো দায়ী করা হয় না।
সরকারের একটি অংশের প্রশ্ন হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কনটেন্টের দৃশ্যমানতা নির্ধারণ করে, তাদের কি তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে একই ধরনের আইনি সুরক্ষা দেওয়া উচিত? এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রাথমিক আলোচনাগুলো আইনে পরিবর্তন আনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে রূপ নেবে কিনা, তা-ও নিশ্চিত নয়।
গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভারতের তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেফ হারবার সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকারের ভাবনা সম্পর্কে সরাসরি হ্যাঁ বা না কোনো উত্তর দেননি। তবে, অনলাইনে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে এসব প্ল্যাটফর্মকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
বৈষ্ণব বলেন, শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল অ্যারেস্টের মতো প্রতারণা এবং নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর অনলাইন কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। তার মতে, আগের মতো শুধু নিয়ম মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; সমাজকে নিরাপদ রাখতে এসব প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।
আরও পড়ুন: নির্বাচনের ফল বানচালের চেষ্টা করছে নেতানিয়াহুর দল
সেফ হারবার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ৭৯ নম্বর ধারায় ইন্টারনেটভিত্তিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে (ইন্টারনেট ইন্টারমিডিয়ারি) শর্তসাপেক্ষে আইনি দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় পক্ষের প্রকাশ করা বা পাঠানো তথ্যের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত আইনি দায়ের মুখে পড়ে না।
তবে, এই সুবিধা পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত মানতে হয়। কোনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া নিজে শুরু করতে পারবে না, তথ্যের প্রাপক নির্ধারণ করতে পারবে না কিংবা আদান-প্রদান করা তথ্য নির্বাচন বা পরিবর্তন করতে পারবে না। পাশাপাশি, সরকার নির্ধারিত যথাযথ সতর্কতামূলক নিয়মও মেনে চলতে হবে।
তবে, এই দায়মুক্তি নিরঙ্কুশ নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে কিংবা বেআইনি কনটেন্টের বিষয়ে আইনসম্মত নির্দেশনা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে তারা এই সুরক্ষা হারাতে পারে।
আরও পড়ুন: আইজেনকটের সামনে ৫ পথ, নেতানিয়াহুর ভুলের অপেক্ষা
২০১৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক শ্রেয়া সিংহল বনাম ভারত সরকার মামলার রায়ও বিষয়টি স্পষ্ট করে। আদালত জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯(৩)(বি) ধারা অনুযায়ী বেআইনি কনটেন্ট সরানোর বাধ্যবাধকতা অবশ্যই আদালতের আদেশ অথবা যথাযথ সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
আধুনিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা হলো এই সেফ হারবার নীতি। কারণ, এ সুবিধা না থাকলে ব্যবহারকারীদের প্রকাশ করা লাখ লাখ পোস্ট, ভিডিও ও মন্তব্যের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনি মামলার মুখোমুখি হতে হতে পারে, এমনকি ওই কনটেন্ট নিজেদের তৈরি না করলেও।
মেটা ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ভিত্তি গড়ে ওঠার পেছনেও এই আইনি সুরক্ষার বড় ভূমিকা রয়েছে। এর ফলে তারা বিপুল পরিমাণ ব্যবহারকারী তৈরি কনটেন্টের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে, অথচ প্রচলিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মতো প্রতিটি কনটেন্টের সম্পাদকীয় দায় নিতে হচ্ছে না।
ভারত সরকারের সাম্প্রতিক আলোচনা তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইনি দায়বদ্ধতা নিয়েই নয়; বরং অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বের সীমা নিয়েও নতুন বিতর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: ১২ বছর পর লিবিয়ায় দূতাবাস চালু করল মিসর
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন