০২:২৬ পি.এম
শরিয়তের পরিভাষায় কখনো কখনো কোরআন ও সুন্নাহতে জাকাতকে ‘সাদাকাহ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম আল-মাওয়ারদি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, ‘সাদাকাহ হলো জাকাত, আর জাকাত হলো সাদাকাহ। এ দুটি একই বিষয়ের দুটি নাম।’ (আল-মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, অধ্যায় ১১)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "আপনি তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র করবেন এবং পরিশুদ্ধ করবেন।" (সুরা তাওবা, আয়াত ১০৩)
অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, "তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যারা সাদাকাহ বণ্টনের ব্যাপারে আপনাকে দোষারোপ করে।" (সুরা তাওবা, আয়াত ৫৮)
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় ৫০০ শিক্ষার্থীর মাঝে খুদ্দামুল কুরআনের কুরআন বিতরণ
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই সাদাকাহ হলো ফকির, মিসকিন…" (সুরা তাওবা, আয়াত ৬০)
হাদিসে জাকাত বোঝাতে সাদাকাহ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "পাঁচ ওয়াসাকের কম পরিমাণ শস্যে কোনো সাদাকাহ (জাকাত) নেই। পাঁচটি উটের কমে কোনো সাদাকাহ নেই। পাঁচ উকিয়ার কম রুপায় কোনো সাদাকাহ নেই।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন হজরত মুয়াজ (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠান, তখন তাঁকে নির্দেশ দেন, "তাদের জানিয়ে দাও, আল্লাহ তাদের সম্পদের ওপর সাদাকাহ (জাকাত) ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে।"
এভাবে কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় জাকাতকে সাদাকাহ বলা হয়েছে। এমনকি জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনকারী ব্যক্তিকেও ‘মুসাদ্দিক’ বলা হয়।
আরও পড়ুন: সকাল-সন্ধ্যায় যেসব জিকির ও দোয়া করবেন
তবে ইসলামের পরবর্তী ইতিহাসে সাদাকাহ শব্দটি সাধারণত ফকির-মিসকিন ও অসহায় ব্যক্তিদের দেওয়া ঐচ্ছিক দান বোঝাতে ব্যবহৃত হতে থাকে। কিন্তু এ প্রচলিত অর্থের কারণে কোরআন নাজিলের সময় শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
সাদাকাহ শব্দটি এসেছে ‘সিদক’ মূলধাতু থেকে। এর অর্থ সত্যবাদিতা, সত্যতা ও আন্তরিকতা। বিচারপতি ইমাম আবু বকর ইবনুল আরাবি (রহ.) জাকাতকে সাদাকাহ বলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, "সাদাকাহ শব্দটি সিদক থেকে উদ্ভূত। সিদক হলো ঘোষিত বিশ্বাসকে কাজের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া। কোনো কিছুকে অন্য কিছুর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা ও সমর্থন করাও সিদক শব্দের মূল অর্থের অন্তর্ভুক্ত।"
বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মোহরকে ‘সাদাক’ বলা হয়। কারণ, নির্দিষ্ট শরয়ি শর্ত ও চুক্তির মাধ্যমে মোহর প্রদান দাম্পত্য সম্পর্কের বৈধতাকে বাস্তবায়ন করে।
সিদক শব্দের বিভিন্ন রূপ রয়েছে। কথার ক্ষেত্রে ‘সাদ্দাকা’ অর্থ হলো কোনো বক্তব্যকে সত্য বলে গ্রহণ করা। আর সম্পদের ক্ষেত্রে ‘তাসাদ্দাকা’ অর্থ হলো দান করা। অর্থাৎ, ব্যক্তি তার বিশ্বাসকে কাজের মাধ্যমে সত্য বলে প্রমাণ করে। অন্যদিকে ‘আসদাকা’ অর্থ হলো নারীদের মোহর প্রদান করা।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ সফরে আসছেন প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার মাওলানা মাহমুদ মাদানি
সাদাকাহ শব্দটি সিদক থেকে এসেছে, কারণ সাদাকাহ প্রদানের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করে। এর মাধ্যমে সে নিজের ঈমানের সত্যতা এবং পুনরুত্থান ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের বাস্তব প্রমাণ দেয়।’ (আহকামুল কোরআন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৯৪৬; আল-বিজাওয়ির ব্যাখ্যাসহ)
ঈমানের সত্যতার প্রমাণ সাদাকাহ
এই কারণে পবিত্র কোরআনে দান-সাদাকাহকে ঈমানের সত্যতা এবং সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখাকে অবিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, "অতএব, যে দান করে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং উত্তম বিষয়কে সত্য বলে বিশ্বাস করে, আমি তার জন্য সহজ করে দেব সহজ পথ। আর যে কৃপণতা করে, নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করে, আমি তার জন্য সহজ করে দেব কঠিন পথ।" (সুরা লাইল, আয়াত ৫-১০)
আরও পড়ুন: আজকের নামাজের সময়সূচি: ৭ নভেম্বর ২০২৬
সুতরাং সাদাকাহ হলো ঈমানের সত্যতা ও কিয়ামতের দিনের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সাদাকাহ হলো প্রমাণ।" (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ, সাদাকাহ মানুষের ঈমানের সত্যতা ও আন্তরিকতার সাক্ষ্য বহন করে।
সূত্র: ড. ইউসুফ আল-কারদাভির ফিকহুয জাকাত গ্রন্থ থেকে প্রবন্ধটি নেওয়া হয়েছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন