০৪:৩৯ পি.এম
ঢাকা, ১ নভেম্বর, ২০২৬ : দক্ষিণ লাওসের সবুজ পাহাড়ি অঞ্চলে ১৩৩টি বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন চীনে নির্মিত হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই টারবাইনগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভিয়েতনামের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে, এই প্রকল্পটি জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার আঞ্চলিক উদ্যোগের অংশ হিসেবেও কাজ করছে।
ডাক ওয়াই গ্রামের কাঠের খুঁটির ওপর নির্মিত বাড়িতে বসে ২৩ বছর বয়সী তুকতা ফনসালা এএফপিকে বলেন, ‘দৃশ্যটা খুব সুন্দর। এগুলো গাছের চেয়েও বড়।’ এ সময় তার কোলে ছিল ছোট্ট শিশু।
লাওসের সেকং প্রদেশ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ আমেরিকায় সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন পোপ লিও
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অসংখ্য বাঁধ নির্মিত হয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে এসব বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি, পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুবিদ্যুতের প্রসারের সময় এসেছে। তারা লাওসের ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ‘মুনসুন উইন্ড পাওয়ার প্রকল্পের’ উদাহরণ দিচ্ছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকল্পটি উৎপাদন শুরু করে।
সিঙ্গাপুরের সমান আয়তনের এলাকায় বিস্তৃত ৭০০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প এশিয়ার প্রথম আন্তসীমান্ত বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটি নির্মাণ করেছে এবং এর মালিকানায় রয়েছে থাইল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম। উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্দিষ্ট সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে সরাসরি ভিয়েতনামের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
আরও পড়ুন: ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া: কেসিএনএ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনাম একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উৎপাদন কেন্দ্র। দেশটি আগে থেকেই তার দরিদ্র প্রতিবেশী লাওস থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করে আসছে।
তবে অলাভজনক সংস্থা এনার্জি ল্যাব এশিয়ার কারিগরি কর্মসূচির প্রধান ট্রিস্টান বেলিংহাম বলেন, ‘অর্থনৈতিক হিসাব এখন বায়ুবিদ্যুতের পক্ষে যাচ্ছে।’ তিনি এএফপিকে বলেন, ‘২০ থেকে ৩০ বছর আগে জলবিদ্যুতের ক্ষেত্রে যেমনটা দেখা গিয়েছিল, এখন নতুন বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি ব্যবহারের অনুমতি ও উন্নয়ন-অধিকার নিশ্চিত করতে তেমনই এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।’
লাওসে ইতোমধ্যে ৯০টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও রয়েছে আরও কয়েক ডজন। ফলে উপযুক্ত নতুন স্থান খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
উন্নয়নের জন্য ভালো-
আরও পড়ুন: শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সিঙ্গাপুরে বিকল্প শীতলীকরণ প্রযুক্তির সন্ধান
বেলিংহাম বলেন, মুনসুন প্রকল্পের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এখন অন্যান্য বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও এগিয়ে যাচ্ছে। লাওসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশজুড়ে ১০ থেকে ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
তুকতা ফনসালা, তার সঙ্গে বসবাসকারী পরিবারের ১৮ সদস্য এবং টারবাইনের আশপাশের ধান ও কফিচাষিদের জন্য মুনসুন প্রকল্প নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়িয়েছে।
তবে প্রকল্পটি থেকে তাদের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারী ঝড়ের সময় এখনো তাদের এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। লাওসের নিজস্ব বিদ্যুৎ অবকাঠামো পুরোনো। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থাটিও বিপুল ঋণের বোঝায় জর্জরিত।
তবু দেশের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিদেশে পাঠাতে পেরে খুশি তুকতা। তিনি বলেন, ‘এটি উন্নয়নের জন্য ভালো এবং সমৃদ্ধি আনতে পারে।’
আরও পড়ুন: শ্রীলঙ্কার যুদ্ধবিধবা ও নিখোঁজদের সন্ধানে দীর্ঘ প্রতীক্ষা
ভিয়েতনামের জন্য এই প্রকল্প তুলনামূলক কম খরচে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের উৎস। ২০২৩ সালে খরার কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশটিতে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। এদিকে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে আগামী বছর থেকে বিদ্যুৎ সংকটের ঝুঁকি রয়েছে বলে সেপ্টেম্বরে সতর্ক করেছিল দেশটির সরকার।
ইন্দোচায়না এনার্জি পার্টনার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থমাস জ্যাকবসেন বলেন, ‘মুনসুন প্রকল্পের মাধ্যমে ভিয়েতনাম স্থানীয়ভাবে যে দামে বায়ুবিদ্যুৎ কিনছে, তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম দামে লাওস থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে।’
তার হিসাব অনুযায়ী, ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ইলেকট্রিসিটি ভিয়েতনাম (ইভিএন) মুনসুন প্রকল্প থেকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রায় ৬ সেন্টে কিনছে। স্থানীয় বাজারের দামের চেয়ে এ হার ২ থেকে ৪ সেন্ট কম।
তবে গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত এক সফরে মুনসুন উইন্ড, ইভিএন এবং প্রকল্পটির অর্থায়ন ব্যবস্থাপক এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিনিধিরা বিদ্যুতের এ দাম জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
আরও পড়ুন: আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বায়োসিকিউরিটি সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্স গেলেন
‘বিশেষ কিছু রয়েছে’-
২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার ভিয়েতনামের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন ইভিএনের ন্যাশনাল পাওয়ার ট্রান্সমিশন করপোরেশনের কর্মকর্তা নিন সুয়ান হিয়েপ।
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে তিনি এএফপিকে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে লাওস থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ ভিয়েতনামের মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশের সমান হবে। স্থাপিত সক্ষমতা বলতে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামর্থ্যকে বোঝায়।
মুনসুন উইন্ড প্রকল্পের মহাব্যবস্থাপক নারুত বোয়াকাজর্ন জানান, প্রকল্পটির উৎপাদন সক্ষমতা আরও ১ হাজার মেগাওয়াট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তি বিদ্যুতের একটি অংশ যেন লাওসের অভ্যন্তরে ব্যবহার করা যায়, সে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: সার্বিয়ায় রেলস্টেশন দুর্ঘটনার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে সরকার পতনে ভূমিকা রাখা ছাত্র আন্দোলনের স্মরণসভা
১১০ মিটার উঁচু একটি টারবাইনের ঘূর্ণায়মান পাখার নিচে এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নারুত বলেন, ‘লাওসে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। বায়ু, পানি ও সৌরশক্তি—সবই আছে।’
তিনি বলেন, ‘একই জায়গায় এতগুলো ভালো নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস খুব বেশি দেশে নেই। এদিক থেকে লাওসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।’
নারুতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় কর এবং স্থানীয় উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা তহবিলসহ বিভিন্ন খাত থেকে লাওস সরকার ১৮০ মিলিয়ন ডলার আয় করবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন