০৪:৪০ পি.এম
দিনাজপুর, ২ নভেম্বর ২০২৩ : দিনপঞ্জীর পাতায় শীতকাল শুরু না হলেও প্রকৃতিতে শীতের আগমনের লক্ষণ স্পষ্ট। এই শীতের আভাসে দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার পল্লীতে গাছিদের মধ্যে ব্যস্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। সারাবছর তেমন কাজ না থাকলেও শীত আসার সাথে সাথে তারা খেজুর তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে খেজুর গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহ করতে গাছিরা একত্রিত হচ্ছেন। এই সময়ে মাটির তৈরি বিশাল এক চুলায় বড় কড়াই বসিয়ে সেখানে খেজুরের রস জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। সুস্বাদু খেজুরের গুড় তৈরির কাজ চলছে।
গুড় তৈরির কাজে নিয়োজিত গাছি মো. হযরত আলী বাসসকে জানান, তারা রাজশাহী জেলার বাঘমারা উপজেলার বাসিন্দা। গত চার বছর ধরে তারা দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর এলাকায় শীত মৌসুমে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করেন। এবছর তারা কার্তিক মাসেই গুড় তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন: উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্পের ৫০ বছরে স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রামীণ উন্নয়ন উদাহরণ
তিনি জানান, প্রতিবছর তারা নবাবগঞ্জ এলাকার খেজুর গাছের মালিকদের কাছ থেকে চুক্তিতে গাছ কিনে থাকেন। এবছর ২৩২টি খেজুর গাছ থেকে প্রতিদিন সকালে রস সংগ্রহ করছেন। সংগৃহীত রস থেকে গুড় তৈরির কাজে তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার দাউদপুরসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারি-সারি খেজুরের গাছে ঝোলানো রয়েছে মাটির হাঁড়ি। ভোরের সূর্য ওঠার আগে গাছিরা রস ভর্তি মাটির হাঁড়ি গাছ থেকে নামাচ্ছেন। এরপর মাটির তৈরি চুলায় টিনের বড় কড়াইয়ে জ্বাল করে গুড়-পাটালি ও লালি তৈরি করছেন। নতুন খেজুর রসের গুড় তৈরির পর তা বাজারে চলে যাচ্ছে। রস সংগ্রহ, গুড় তৈরি ও বাজারে বিক্রি করতে তারা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের হযরত আলী (৪৫), জাকির হোসেন (৪২), জাহিরুল হক (৩৮), রফিক উদ্দিন (৪৪), মানিক হাসান (৪৫) ও হাজির আলী (৩৮)সহ ৬ জন একসাথে খেজুরের গুড় তৈরির কাজে এ এলাকায় এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা এই কাজ করে আসছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বছরের ৫ মাস তারা এই কাজ করেন। বাকি সময় এলাকায় থেকে অন্য কাজ করেন।
গাছি হযরত আলী বলেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকে এই কাজ শিখেছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে চুক্তিতে খেজুর গাছ নিয়ে রস নামিয়ে গুড় তৈরি করে বিক্রি করি। আশ্বিন মাসের ২২ তারিখে এবারে দিনাজপুরে নবাবগঞ্জ উপজেলায় এসেছি। খেজুর গুড় তৈরি করাই আমাদের মূল ব্যবসা। বাকি সময় আমার এলাকায় অন্য ছোট ব্যবসা বা কৃষিকাজ করে থাকি।’
আরও পড়ুন: উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্পের ৫০ বছর: গ্রামীণ উন্নয়নে স্বেচ্ছাশ্রমের উদাহরণ
তিনি জানান, এবছর ২৩২টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন তারা। এসব রস থেকে খেজুরের গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রস্তুত করা প্রতিটি গাছ থেকে প্রতিদিন রস সংগ্রহ করা হয়। প্রত্যেক গাছ থেকে শুরুতে দুই থেকে আড়াই কেজি করে রস সংগ্রহ হয়। পরে আস্তে-আস্তে তা বেড়ে ৩ থেকে ৪ কেজি পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা যায়। প্রথমদিকে প্রতিদিন আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ কেজি করে খেজুরের গুড় তৈরি হয়। এক পর্যায় ক্রমে বেড়ে ১ থেকে ২ মণ পর্যন্ত গুড় তৈরি হয়। প্রতি কেজি খেজুরের গুড় বাজারে পাইকারদের কাছে ২৩০ টাকায় এবং খুচরা ২৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
শীতের আগমনে গ্রামের ঘরে-ঘরে খেজুর রসের পিঠা, পায়েস, গুড়ের মুড়ি-মুড়কি ও নানা ধরনের মুখরোচক খাবার তৈরির ধুম পড়ে। তবে অনেকেই বলছেন, বাজারে চিনির দাম বেশি। চিনির দামের থেকে খেজুর গুড়ের দাম একটু বেশি হলেও সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে খেজুরের গুড়ের চাহিদা অনেক বেশি।
গুড় ক্রেতা স্কুল শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বাসসের সাথে আলাপকালে বলেন, কার্তিক মাসেই শীতের আমেজ শুরু হয়েছে। পিঠা-পায়েস খেতে স্বাদে গন্ধে সুস্বাদু খেজুরের গুড় অতুলনীয়। গাছিদের তৈরি গুড় খুবই সুস্বাদু ও মানসম্মত। তারা সবার সামনে খেজুরের রস সংগ্রহ করে প্রকাশ্যে গুড় তৈরি করেন। সে কারণে এখানে খেজুরের রস থেকে প্রস্তুত করা নির্ভেজাল গুড় কিনতে এসেছি। গুড় তৈরির পর প্রতিদিন অনেক লোকজন এসব টাটকা গুড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. তরিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, আমি কয়েক দিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদারসহ গাছিদের গুড় তৈরির কাজ পরিদর্শন করেছি। তাদের তৈরি করা গুড় খুবই সুস্বাদু এবং এলাকায় গ্রাহক পর্যায়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রী টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন
নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিধান কান্তি হালদার বলেন, গাছিদের গুড় তৈরি কার্যক্রম পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবেই করতে বলেছি এবং সে ভাবেই তারা গুড় তৈরি করছেন। শীতের আগমনে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে খেজুর গুড় তৈরির এ যেন এক মহা উৎসব।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন