০৩:৫৬ পি.এম
দেশের বাজার ভেজাল শিশুখাদ্যে সয়লাব হয়ে গেছে। জেলি, জুস ও আইস ললি তৈরিতে কৃত্রিম রং, ফ্লেভার এবং রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। চকলেট-সন্দেশ তৈরিতে আরও ভয়াবহ উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। পচা মিষ্টির সিরা ও নষ্ট দইয়ের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে শিশুদের জন্য এসব খাবার। সময় সংবাদে ক্যামেরায় ধরা পড়েছে শিশুখাদ্য তৈরির এমন ভয়ংকর চিত্র।
সময় সংবাদ যখন উপস্থিতি টের পায়, তখন অধিকাংশ কারখানার ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। তবে কৌশলে রূপগঞ্জের একটি কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে সময় সংবাদ। প্রবেশের সময় কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা সরে গেছেন। পুরো কারখানায় ফলের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ এখানে আম, লিচু, আনারসসহ বিভিন্ন ফলের জেলি, জুস ও আইস ললি তৈরি করা হয়।
ক্যামেরায় এসব খাবার তৈরিতে রাসায়নিক উপাদান ও ক্ষতিকর রং ব্যবহারের চিত্র ধরা পড়ে। কারখানার দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তি জানান, তারা আসল ফলের পরিবর্তে কৃত্রিমভাবে শিশুখাদ্য তৈরি করেন।
আরও পড়ুন: পিএসসির নতুন সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন অধ্যাপক শামীমা সুলতানা
কারখানার ভেতরের আরেকটি কক্ষে গিয়ে দেখা যায় আরও ভয়াবহ চিত্র। সেখানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে পচা পণ্য ও ময়লা-আবর্জনা। সেখান থেকেই জেলি বের করছেন কয়েকজন। পরে এসব জেলি আবার প্যাকেটজাত করে বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে।
সাভারের আরেকটি কারখানায় শিশুদের চকলেট ও সন্দেশ তৈরি হচ্ছে। সেখানে অসংখ্য ড্রামে জমিয়ে রাখা হয়েছে পাঁচ থেকে ছয় দিন আগের পচা মিষ্টির সিরা। সেই সিরা দিয়েই তৈরি হচ্ছে শিশুদের জন্য সন্দেশ, যা কয়েক দিনের মধ্যেই বাজারে ছড়িয়ে দেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
প্যাকেটের গায়ে দুধ, চিনি ও বিভিন্ন উপাদানের কথা উল্লেখ থাকলেও ড্রামগুলোতে রয়েছে শুধু মিষ্টির সিরা ও পচা দই। এর মধ্যে মরে পচে আছে মাছি ও বিভিন্ন পোকামাকড়। এসব উপাদান গরম করেই তৈরি করা হচ্ছে সন্দেশ ও চকলেট। কারখানার পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। চারদিকে দুর্গন্ধে টেকা দায়।
মিষ্টির সিরা ও ফ্লেভার ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানার এক কর্মচারী জানান, তারা মিষ্টির দোকান থেকে ফেলে দেয়া মিষ্টির সিরা সংগ্রহ করে আটা দিয়ে জ্বাল দেন। এতে মিষ্টির স্বাদ ও ফ্লেভার পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: স্পিকারের সঙ্গে ঢাকায় নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
এরপর কারখানার মালিক পরিচয়ে দুই জন ব্যক্তি সময় সংবাদের সামনে হাজির হন। তারা জানান, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে নয়, বরং টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেই এসব কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এমনকি টাকা দিয়ে সময় সংবাদকেও সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন তারা। তাদের একজন বলেন, ‘কিছু টাকা-পয়সা দেই। গরিব মানুষ, অনেক কষ্ট করি। ওই নিউজটা করে আমাদের ক্ষতি করবেন না।’
শুধু একটি বা দুটি কারখানা নয়, রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ায় তৈরি হচ্ছে এমন ক্ষতিকর শিশুখাদ্য। এসব কারখানায় তৈরি পণ্যের গন্তব্য পুরান ঢাকার চকবাজার। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে এসব খাবার।
এ বিষয়ে মুদি দোকানিরা বলছেন, তারা বিক্রি বন্ধ করলেও অন্য দোকানে এসব পণ্য বিক্রি হবে। একজন দোকানি বলেন, ‘আমি যদি না বিক্রি করি, দেখা যাবে আমার পরিবর্তে আরেকটা দোকান বিক্রি করবে। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকেই এসব চলছে, এর কী হবে? এসব জিনিস বিক্রি করলেও আমি আমার বাচ্চাকে খাওয়াই না।’
দেশের শিশুখাদ্যের এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কী করছে, তা জানতে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হয় সময় সংবাদ। তবে তাদের বক্তব্যে হতাশার চিত্র উঠে আসে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আরও পড়ুন: নিজ উদ্যোগে খেলার মাঠ তৈরি, বাবুপুর গ্রাম হতে পারে রোলমডেল
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্যশিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘ভেজালবিরোধী বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিচালনা করছি। তারপরও এসব কমছে না। এর মূল কারণ তাদের অসততা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করি, তাদের পক্ষে এককভাবে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
উৎপাদন থেকে শুরু করে বিক্রি-সবই চলছে প্রকাশ্যে। অথচ এসব বন্ধে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শিশুদের জন্য তৈরি খাবারেই যখন বিষাক্ত ও পচা উপাদান ব্যবহার হচ্ছে, তখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে-সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন