০৪:৩৭ পি.এম
মোশতাক আহমদ
ঢাকা, ১ নভেম্বর, ২০২৬ : দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে জমির রেকর্ড সংগ্রহ, খতিয়ান যাচাই এবং ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রেকর্ড রুমের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের এ পর্যন্ত আট কোটির বেশি খতিয়ান বা পর্চা ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এটি জমির রেকর্ড সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে বারবার যাতায়াতের প্রয়োজন কমিয়ে, সময় ও অর্থ সাশ্রয় করার পাশাপাশি সহজে ভূমিসংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুন: গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেন বেড়েছে ১৩.৮৮ শতাংশ
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পারভেজ হাসান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, দেশের সব খতিয়ান সরকারি ব্যবস্থায় অনলাইনে আপলোড করার লক্ষ্যে ডাটা এন্ট্রি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় ইতোমধ্যে ১১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পরবর্তী সময়ে সারা দেশে কার্যক্রমটি সম্প্রসারণের জন্য একটি ক্রয় প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদন এবং পরবর্তী দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
প্রকল্প পরিচালকের মতে, সব খতিয়ান অনলাইনে পাওয়া গেলে জমিজমা নিয়ে মানুষের দৈনন্দিন বিরোধ অনেকাংশে কমতে পারে। নাগরিকেরা সহজেই অনলাইন থেকে নিজেদের জমির খতিয়ান সংগ্রহ করতে পারবেন। এর ফলে জমির রেকর্ড খুঁজতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরাঘুরি এবং তথ্য সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনলাইন ভূমিসেবার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের পুরোনো খতিয়ান ও ভূমিসংক্রান্ত নথি ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, পর্যায়ক্রমে সব খতিয়ানের তথ্য অনলাইনে নিয়ে আসা, যাতে নাগরিকেরা সহজে নিজেদের জমির রেকর্ড খুঁজে পেতে পারেন এবং ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবহার করতে পারেন।
আরও পড়ুন: সরকার ৩ মাসে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে: পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত খতিয়ানের সংখ্যা আট কোটি ছাড়ানোর বিষয়টি দেশের ভূমি প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এই সংখ্যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রেকর্ড রয়েছে। একদিকে রয়েছে সিএস, এসএ, আরএস ও বিএসসহ বিভিন্ন জরিপের খতিয়ান।
অন্যদিকে রয়েছে ই-নামজারির মাধ্যমে তৈরি ও হালনাগাদ হওয়া খতিয়ান।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, অনলাইন সার্ভে খতিয়ানের ডাটাবেজে প্রায় পাঁচ কোটি ১২ লাখ থেকে পাঁচ কোটি ১৩ লাখ খতিয়ান রয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় পাঁচ কোটি ১২ লাখ খতিয়ান অনলাইনে উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ই-নামজারি এবং অন্যান্য ভূমিসেবা ডিজিটাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাটাবেজে রেকর্ডের সংখ্যা বেড়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে ই-নামজারি ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ৫১৬টি উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ৩ হাজার ৪৬৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ই-নামজারি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইনে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ লাখ নামজারি মামলা নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: গার্মেন্টস খাতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার
নামজারি হলো জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের তথ্য হালনাগাদ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। জমি ক্রয়, উত্তরাধিকার, দান বা অন্যান্য বৈধ উপায়ে মালিকানা পরিবর্তনের পর প্রযোজ্য নিয়মে নামজারি প্রয়োজন হতে পারে। এ প্রক্রিয়া ডিজিটাল হলে আবেদন গ্রহণ, নথি যাচাই, মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত জানার ক্ষেত্রে নাগরিকদের সুবিধা বাড়ে।
আগে নামজারি বা খতিয়ান সংগ্রহের কাজে অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার ভূমি অফিসে যেতে হতো।
প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, আবেদন কোথায় রয়েছে তা জানা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সময় ব্যয় করতে হতো। অনলাইন ব্যবস্থার কারণে এসব ধাপের কাজগুলো সহজ হয়ে গেছে।
ভূমি উন্নয়ন কর অনলাইনে আদায়ের ব্যবস্থাও ডিজিটাল ভূমিসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, ই-পর্চা এবং ই-নামজারির মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত ভূমিসেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন খাতে রাজস্ব জমার হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে।
আরও পড়ুন: এশিয়ান পেইন্টসের সহযোগিতায় আইএবি অ্যাওয়ার্ডসে ১০টি পুরস্কার প্রদান
এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কোটি ৭০ লাখ হোল্ডিংয়ের তথ্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে এবং প্রায় এক কোটি ১০ লাখ অনলাইন দাখিলা দেওয়া হয়েছে। ই-পর্চার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সরকারের কোষাগারে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে।
ডিজিটাল খতিয়ানের ফলে সরাসরি জমির রেকর্ড সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। অনলাইনে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান নাগরিকেরা ঘরে বসে তথ্য অনুসন্ধান করতে পারবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদনও করতে পারবেন। এতে যাতায়াত খরচ, কর্মঘণ্টার অপচয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জমি কেনাবেচার আগে ক্রেতার জন্য রেকর্ড যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ব্যবস্থায় খতিয়ানের তথ্য সহজে পাওয়া গেলে জমির দাগ নম্বর, রেকর্ডভুক্ত মালিকের নাম এবং জমির পরিমাণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সহজ হবে।
একইভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড খুঁজে বের করা, পুরোনো দলিলের তথ্যের সঙ্গে খতিয়ান মিলিয়ে দেখা এবং নামজারির প্রস্তুতি নেওয়ার কাজও সহজ হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: ব্র্যাক ব্যাংক দেশে প্রথম ওমনিচ্যানেল ব্যাংকিং সেবা চালু করলো
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এ ধরনের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে অবস্থান করেও অনলাইনে জমির রেকর্ড খুঁজে দেখা গেলে দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরতা কমবে।
জমির তথ্য যাচাইয়ের প্রাথমিক কাজ দ্রুত করা সম্ভব হবে। তবে প্রয়োজনীয় পরিচয় যাচাই, অনুমোদিত আবেদন এবং সার্টিফাইড কপি সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
ডিজিটাল রেকর্ড প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে। তথ্য সংরক্ষণ ও অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় আসায় নথি খুঁজে পেতে বিলম্ব, কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি দূর হয়েছে। একই সঙ্গে ভূমিসেবার আবেদন, ফি পরিশোধ ও নিষ্পত্তির তথ্য ডিজিটাল উপায়ে সংরক্ষিত থাকলে সেবার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
তবে এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে ওয়েবসাইট ও সার্ভারের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম, তথ্যের নিরাপত্তা, সহজ ব্যবহারব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: মজুরি বোর্ড গঠন, শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান মন্ত্রীর
তারা বলছেন, ডিজিটাল সেবা চালু থাকলেও কেউ যদি নিজের জমির তথ্য খুঁজে না পান, ভুল তথ্য সংশোধন করতে না পারেন কিংবা আবেদন সম্পর্কে জানতে না পারেন, তাহলে প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
ডিজিটাল ভূমিসেবার পাশাপাশি ভূমি অফিসগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সারাদেশে ১ হাজার ৩৩০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ এবং ১৫০টি সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে ভূমির নথি সংরক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ এবং নাগরিকদের সেবা গ্রহণের পরিবেশ উন্নত হবে। পুরোনো কাগুজে নথি নিরাপদে সংরক্ষণ করা গেলে সেগুলো ডিজিটাইজ করার কাজেও সুবিধা হবে। কারণ, ডিজিটাল ডাটাবেজের নির্ভুলতা অনেকাংশে নির্ভর করে মূল নথির পাঠযোগ্যতা, সংরক্ষণ এবং যাচাইয়ের ওপর।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে ড্রোন ব্যবহার করে ভূমি জরিপের চিন্তা-ভাবনাও রয়েছে সরকারের। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জরিপের সময় কমানো এবং তথ্য সংগ্রহের নির্ভুলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে জমিসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, রাজস্ব মামলা ব্যবস্থাপনা এবং ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ কমানোর ক্ষেত্রেও ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা সহায়ক হতে পারে। সরকারি জমির রেকর্ড সহজে অনুসন্ধানযোগ্য হলে দখল, রেকর্ডের অসামঞ্জস্য এবং মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী বাসসকে বলেন, ‘ভূমিসেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে সরকার ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ করছে। সব খতিয়ান পর্যায়ক্রমে অনলাইনে আনা সম্ভব হলে নাগরিকেরা ঘরে বসেই তাদের জমির রেকর্ড সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারবেন। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভূমি অফিসে মানুষের যাতায়াত কমবে। একই সঙ্গে ভূমির রেকর্ড সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং জমিজমা নিয়ে বিরোধ কমাতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার সুফল নিশ্চিত করতে তথ্যের নির্ভুলতা, নিয়মিত হালনাগাদ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সহজে সেবা পাওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর সেবার পাশাপাশি পুরোনো রেকর্ড সংরক্ষণ ও যাচাই, ভুল তথ্য সংশোধন এবং নাগরিকের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন