মঙ্গলবার, ২৭শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
১১:১৪ এম
ফুটবলারের জুতোর কথা মনে হলে চোখের সামনে কী ভাসে? মাঠের ঘাসের ওপর ছুটে চলা একজোড়া বুট, যেগুলো বলের দিকে লাথি মারছে, আর তার তালে জাল কাঁপছে, গ্যালারিতে উল্লাসের স্রোত বইছে। এটাই তো?
এবার একটু ভিন্নভাবে ভাবা যাক। যদি সেই জুতোর মাপ বড় হয়ে যায়? ফুটবলারদের জুতোর মাপ অবশ্যই নিখুঁত হতে হয়, কারণ একটু এদিক-ওদিক হলে খেলোয়াড় মাঠে পড়ে যেতে পারেন; যখন লাখো দর্শকের সামনে সরাসরি সম্প্রচার হবে, তখন প্রস্তুতকারকদের বাজারদর নিমিষেই পড়ে যাবে। তবে, হয়তো ভুল বলা হচ্ছে। বড় মাপের সেই ‘জুতো’ কিন্তু কারো জীবনও বদলে দিতে পারে।
নাইজেরিয়ার অনেক শিশুর জন্য সেই ‘বড় জুতো’ এসেছে একেবারে ভিন্ন রূপে। সেই জুতো তাদের অস্ত্রোপচারের টেবিলে নিয়ে গেছে, নতুন জীবন দিয়েছে, যা তাদের নতুন পথচলার শুরু।
এই ‘বড় জুতোর’ গল্পের নায়ক হলেন আর্সেনালের উইঙ্গার বুকায়ো সাকা। ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে তিনি ‘সক্রেটিস’ পুরস্কার অর্জন করেছেন। তবে, এটি গোলের জন্য নয়। বরং ‘বড় জুতো’ বা ‘বিগ শু’র জন্য।
ফ্রান্স ফুটবল ম্যাগাজিন এবং ‘পিস অ্যান্ড স্পোর্ট’ সংস্থা ২০২২ সালে এই সক্রেটিস পুরস্কার চালু করে। পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে প্রয়াত ব্রাজিলীয় কিংবদন্তি সক্রেটিসের নামে, যিনি সামাজিক অবস্থান এবং গণতন্ত্রের পক্ষে সওয়াল করার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি তার খ্যাতি ও সম্পদকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছিলেন। যারা তার পথ অনুসরণ করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবেন, তাদের জন্য এই পুরস্কার।
পুরস্কারের তালিকাও চিত্তাকর্ষক। ২০২২ সালে প্রথমবারের জন্য সেনেগালের সাদিও মানে পেয়েছিলেন, যিনি নিজের গ্রাম বাম্বালিতে হাসপাতাল এবং স্কুল নির্মাণের জন্য। ২০২৩ সালে ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, যিনি শিশুদের শিক্ষা এবং বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ের জন্য পুরস্কৃত হন। ২০২৪ সালে স্পেনের জেনি এরমোসো, যিনি নিপীড়ন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার স্বীকৃতি পান। ২০২৫ সালে লুইস এনরিকের পরিবারের ‘শানা’ ফাউন্ডেশন, গুরুতর অসুস্থ শিশুদের এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য পুরস্কৃত হন। সাকা সেই তালিকায় অনেক আগেই জায়গা করে নিয়েছিলেন, এবার পেলেন ‘স্বীকৃতি’।
তার কাজটি কী? জার্মান দাতব্য সংস্থা ‘বিগশু’-র সঙ্গে সহযোগিতা করে তিনি নাইজেরিয়ায়, অর্থাৎ তার বাবা-মায়ের দেশে, শিশুদের অস্ত্রোপচারের খরচ বহন করেছেন। তার সহায়তায় ১২০টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। হার্নিয়া থেকে ব্রেন টিউমার, কোনোটিই ছোট বিষয় নয়।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘বড় জুতোয় পা গলানো’ সহজ কাজ নয়। সেখানে দায়িত্বের মাপ পায়ের মাপের চেয়ে বড়। কিন্তু সাকা সেই জুতোয় পা গলিয়েছেন নিঃশব্দে, ক্যামেরার আড়ালে।
মাঠের বুট গোল করে। কিন্তু এই জুতো কাউকে দাঁড়াতে শেখায়। বুকায়ো সাকার সে ‘বড় জুতো’ ছিল ঠিক মাপেরই, তাই না?
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ : ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাত দিনব্যাপী কর্মসূচির ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচিগুলি আগামী ৫ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত পালন করা হবে।
বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য জানান।
আজ বেলা ১২টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের একটি যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সর্বসম্মতিক্রমে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। সভায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিববৃন্দ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, ৭ নভেম্বর সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয়গুলোতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
একই দিন সকাল ১১টায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন।
দিবসটি উপলক্ষে ৭ নভেম্বর বেলা ৩টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হবে। একই দিন সারাদেশের জেলা ও মহানগর পর্যায়ে বিএনপির উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া, ৮ নভেম্বর সারাদেশের থানা ও উপজেলা পর্যায়ে র্যালির আয়োজন করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো আলোচনা সভা ও অন্যান্য কর্মসূচি পালন করবে।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৬ নভেম্বর শুক্রবার বেলা ৩টায় বিএনপির উদ্যোগে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া, যুবদল ১০ নভেম্বর আলোচনা সভা, শ্রমিক দল ৫ নভেম্বর আলোচনা সভা, কৃষক দল ৯ নভেম্বর সকাল ১১টায় আলোচনা সভা এবং জাসাস ৯ নভেম্বর বিকেল ৩টায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
ছাত্রদল ৭ নভেম্বর সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং ৮ নভেম্বর আলোচনা সভার আয়োজন করবে। ওলামা দল এতিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করবে।
৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে যৌথসভায় গৃহীত কর্মসূচি সফল করার জন্য ঢাকাসহ সারাদেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
চট্টগ্রাম, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ : ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নভেম্বর মাস পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার পাশাপাশি মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বৃষ্টির পরিমাণ কমলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়ে যায় না। বিগত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, নভেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে। সুতরাং, এই সময়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।
আজ নগরের টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রশাসক এসব কথা বলেন।
সভায় সিভিল সার্জন অফিসের হালনাগাদ পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয় এবং নগরীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলমান কার্যক্রম ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ৩ হাজার ২১০ জন, জেলার উপজেলাগুলোতে ২ হাজার ৭৬২ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগের অন্যান্য জেলা থেকে আগত ৭০৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মোট ৩৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে। তাদের মধ্যে মহানগর এলাকায় ১২ জন, উপজেলা পর্যায়ে ১৪ জন এবং অন্যান্য জেলার সাতজন রয়েছেন। মৃতদের মধ্যে ১৮ জন নারী, ৯ জন শিশু ও ছয়জন পুরুষ। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ৯১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
মহানগর এলাকার মধ্যে হালিশহরে সর্বোচ্চ ৪৩৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া কোতোয়ালীতে ৩৩৪ জন, বন্দরে ৩২৪ জন, পাহাড়তলীতে ৩০৪ জন এবং বাকলিয়াতে ২৫৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ ৮৪৮ জন, কর্ণফুলীতে ৩২৩ জন এবং বাঁশখালীতে ২৩১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৪৩০ জন এবং অক্টোবরে ২ হাজার ১২৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
প্রশাসক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথ চিকিৎসাসেবা— এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
সভায় জানানো হয়, চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বর্তমানে প্রতিটি ছোট ওয়ার্ডে তিনজন করে এবং বড় ওয়ার্ডগুলোতে পাঁচজন করে কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শ কর্মী এ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। মশক নিয়ন্ত্রণে বিটিআইসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ এবং অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
চসিক প্রশাসক এসব কার্যক্রম নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শামীম মোহাম্মদ খান, ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন থানার এলাকায় নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে ৫৪৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। এই সময়ের মধ্যে ৩৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আজ ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মিরপুর বিভাগ থেকে ১৫০ জন, ওয়ারী বিভাগ থেকে ৯৪ জন, তেজগাঁও বিভাগ থেকে ৭৪ জন, গুলশান বিভাগ থেকে ৬২ জন, মতিঝিল বিভাগ থেকে ৪৮ জন, লালবাগ বিভাগ থেকে ৪২ জন, উত্তরা বিভাগ থেকে ৩৭ জন, রমনা বিভাগ থেকে ৩৩ জন এবং গোয়েন্দা বিভাগ থেকে ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অভিযানের সময় গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১টি সুইচ গিয়ার, ১টি প্লায়ার্স, ১টি অ্যান্টি কাটার, ১টি অবিস্ফোরিত ককটেল, ১টি বিস্ফোরিত ককটেলের অংশবিশেষ, ১ হাজার ১২১ পিস ইয়াবা, ২৮ গ্রাম হেরোইন, ১টি অটোরিকশা, ১৫টি মোবাইল ফোন, ১৩টি সিমকার্ড এবং ১ জন ভিকটিম।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
রুদ্র আল মুত্তাকিন
ঢাকা, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ : মানুষের জীবনকে কি ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? সম্ভব নয়, হয়তো! তবে কিছু স্থান ও কাল মানুষের জীবনের সঙ্গে এতটাই সম্পর্কিত থাকে যে, তাদেরকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় সেই মাটির কাছে। সেই ধুলো-মাটি, জল-হাওয়া, লোকজীবন এবং বিস্মৃত স্মৃতির কাছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বোঝার জন্যও এমন একটি ফিরে দেখা অপরিহার্য। বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ধূমকেতুর মতো। যাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, যাঁর কবিতায় প্রেম ও বিদ্রোহ পরস্পরকে আলিঙ্গন করেছিল—তাঁর জীবনেও রয়েছে কিছু ভৌগোলিক সফরের স্মৃতি, যাদের কথা বললে ইতিহাসের ‘গম্ভীর’ বয়ান কিছু সময়ের জন্য থেমে যায়, কান পাততে হয় মাটির নিজস্ব ভাষায়।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল এমন একটি স্থান যা কবি নজরুলের জীবনে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলেছে। এখানে নজরুল কবি হিসেবে আসেননি, বরং এসেছিলেন এক কিশোর হিসেবে। সামনে ছিল অনিশ্চিত জীবনের দীর্ঘপথ। ত্রিশালযাপনের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন। কে জানত যে এই কিশোরের নাম একদিন বাংলা ভাষার সবচেয়ে দুর্দম উচ্চারণগুলোর একটি হয়ে উঠবে! আজ এত বছর পর ‘ত্রিশালে নজরুলের স্মৃতির’ পথে হাঁটতে হাঁটতে তাই শুধু নজরুলের স্মৃতিচিহ্ন খুঁজলেই হবে না, খুঁজতে হবে সেই সময়ের সেই কিশোরের স্পন্দন, কিশোরের বেড়ে ওঠার অনুষঙ্গ, এবং ত্রিশাল কীভাবে ধারণ করে রেখেছে তার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অথচ বহুমাত্রিক অধ্যায়। কারণ, নজরুলকে ফিরে দেখা মানে কেবল একজন কবিকে স্মরণ করা নয়, বরং তার সময়কেও নতুন করে পাঠ করা।
কবি নিজেও বিভিন্ন বয়সে ত্রিশালের স্মৃতি স্মরণ করেছেন। তাঁর রচিত একটি গল্প ‘অগ্নিগিরি’ এর মাধ্যমে আমরা কিশোর নজরুলের ত্রিশাল ভ্রমণ সম্পর্কে জানব।
‘অগ্নিগিরি’ গল্পের পটভূমি ও বাস্তব ত্রিশাল:
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অগ্নিগিরি’ ছোটগল্পটির প্রেক্ষাপট হলো ত্রিশাল। গল্পটিতে সরাসরি উল্লেখ রয়েছে ‘ত্রিশালের মাদ্রাসা’, ‘গফরগাঁও-এর জমিদারের হাতি’ এবং ‘ময়মনসিংহের হাসপাতাল’-এর মতো বাস্তব উপাদান। নজরুল তাঁর এই গল্পে যে ‘বীররামপুর’ গ্রামের চিত্র এঁকেছেন, তা মূলত বাস্তব জীবনের ‘দরিরামপুর’ গ্রামকেই নির্দেশ করে।
বাস্তবতার সঙ্গে গল্পের এই মেলবন্ধন আরও স্পষ্ট হয় ভৌগোলিক অবস্থানের বর্ণনায়। নজরুল ত্রিশালে থাকাকালীন শেষপর্যন্ত নামাপাড়ার বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে জায়গির ছিলেন। এই বাড়ির ঠিক পাশের গ্রামটি হলো ছলিমপুর। ছলিমপুরের মানুষজন বিচ্যুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি পেরিয়ে এবং একটি বটগাছ অতিক্রম করে দরিরামপুর বাজারে যাতায়াত করতেন। এই বাস্তব ভৌগোলিক চিত্রটিই গল্পে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
কৈশোরের স্মৃতি ও নজরুলের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি:
ত্রিশালের মাটিতে পা রাখার সময় কাজী নজরুল ইসলামের বয়স ছিল চৌদ্দ কি পনেরোর কাছাকাছি। এই বয়সে পৃথিবীকে দেখার চোখ তৈরি হয়। নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু জীবন তখনো নজরুলের জন্য স্থির কোনো আশ্রয় সাজিয়ে রাখেনি। পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়ে আসা, নতুন মানুষের সংসারে জায়গা করে নেওয়া, এক আশ্রয় ছেড়ে অন্য আশ্রয়ে যাওয়া—এই ছিল তাঁর ত্রিশাল জীবনের বাস্তবতা। পরে যে মানুষটি বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের এক অনন্য ভাষা হয়ে উঠবেন, তাঁর কৈশোরের দিনগুলোতেও কি সেই স্বাধীনচেতা সত্তার কোনো আভাস ছিল?
প্রশ্নটি আরও কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে ওঠে নজরুলের ‘অগ্নিগিরি’ গল্পের কাছে গেলে। গল্পের চরিত্র, সম্পর্ক ও ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে কবির ত্রিশাল-জীবনের কিছু সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে উঠে এসেছে সবুর, নূরজাহান ও রুস্তমের প্রসঙ্গ। গল্পের ভেতরকার মানুষদের সঙ্গে নজরুলের বাস্তব জীবনের কোনো মানুষের মিল ছিল কি না, কিংবা কৈশোরের কোনো অভিজ্ঞতা গল্পের উপাদান হয়ে উঠেছিল কি না—এসব প্রশ্ন পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক শতাব্দীরও বেশি আগের ত্রিশালে।
নজরুল ১৯১৪ সালের জুনে দারোগা রফিজউল্লাহর সঙ্গে ত্রিশালে এসেছিলেন। ভর্তি হয়েছিলেন দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে, বর্তমানে যা নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত। শুরুতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল কাজীর শিমলা গ্রামে। সেখান থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন এই পথ হেঁটে যাতায়াত করতে হতো তাঁকে। পরে রফিজউল্লাহ তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন নামাপাড়া গ্রামের কাজী হামিদুল্লাহর বাড়িতে। সেখানেও বেশিদিন থাকা হয়নি তাঁর। এরপর আশ্রয় মেলে বিচ্যুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে, পুকুরের পাশে ছোট্ট একটি ঘরে।
এই বাড়ি বদলের ঘটনাগুলো নিছক জীবনী-তথ্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কিশোর বয়সে জায়গির থাকার অভিজ্ঞতা, নিজের ইচ্ছা ও অন্যের নিয়মের মধ্যে টানাপোড়েন, আর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যাওয়ার বাস্তবতা—এসবের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে মানুষের বেড়ে ওঠার গল্প। ‘অগ্নিগিরি’র সবুরের সঙ্গে নজরুলের জীবনের তুলনা টানতে গেলে এই অভিজ্ঞতার জায়গাটিই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কেননা সবুরের জীবনেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। তবে মিল থাকলেই যে চরিত্রটি কবির আত্মপ্রতিকৃতি, তা নিশ্চিত বলা যায় না।
ত্রিশাল তাই এখানে শুধু নজরুলের জীবনের একটি অধ্যায়ের নাম নয়। তাঁর কৈশোরের বাস্তবতা আর সাহিত্যের সম্ভাব্য অনুরণনকে পাশাপাশি রেখে দেখা যায়। ‘অগ্নিগিরি’ সেই দেখার একটি জানালা খুলে দেয়।
ত্রিশালের এই দিনগুলোতে একদিকে যেমন ছিল ময়মনসিংহের শ্যামল প্রকৃতি ও আতিথেয়তা, অন্যদিকে ছিল নিঃসঙ্গতা ও কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা। ‘ভিনদেশি’ কথনরীতির কারণে স্থানীয় বালকদের কাছে উত্ত্যক্ত হওয়া, কিংবা তাঁর প্রতিভা (গান গাওয়া, বাঁশি বাজানো, পরীক্ষায় প্রথম হওয়া) দেখে সহপাঠীদের ঈর্ষা করার মতো ঘটনাও তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
কৈশোরের সেই অম্লমধুর স্মৃতি নজরুল কখনো ভোলেননি। ১৯২৬ সালের গফরগাঁওয়ের প্রজা সম্মিলনীতে পাঠানো চিঠিতেও তিনি ময়মনসিংহের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর অশেষ ঋণ এবং শৈশবের উজ্জ্বল স্মৃতির কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। ‘অগ্নিগিরি’ গল্পের মাধ্যমে নজরুল তাঁর কিশোর বেলার সেই চেনা ভূমি, চেনা মানুষ আর ফেলে আসা দিনগুলোকেই সাহিত্যের পাতায় চিরদিনের জন্য অমর করে রেখে গেছেন।
এই প্রসঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক মাওলা প্রিন্স বলেন, ‘ত্রিশাল অধ্যায় বাদ দিয়ে নজরুলের জীবন বিচার করার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, তিনি ত্রিশালে এসেছিলেন 'মানুষ হতে' এবং ময়মনসিংহ জেলার কাছে তিনি 'অশেষ ঋণে ঋণী'। তাঁর জীবনে প্রথমত ত্রিশাল এবং দ্বিতীয়ত করাচি ছিল দূরদেশ ভ্রমণ বা অবলোকন। তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মে এই দুই অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষের সমাহার ঘটেছে। 'অগ্নিগিরি' ছোটগল্প, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁকে লেখা চিঠি ও গফরগাঁও নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মেলনে পাঠানো অভিভাষণে ত্রিশাল কেন্দ্রিক তাঁর স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও সাহিত্যিক সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।’
বর্তমানে ত্রিশালে নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণে করণীয়:
কবি নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণে ত্রিশালে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কাজীর শিমলায় দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়ি ও নামাপাড়ায় বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুটি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র। সেখানে কবির স্মারক, আলোকচিত্র ও বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কবির স্মৃতিবিজড়িত দরিরামপুর হাইস্কুল বর্তমানে নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত। ২০০৬ সালে ত্রিশালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। একই বছর বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে চালু হয় ‘নজরুল পর্যটন’ কর্মসূচি। এছাড়া প্রতিবছর কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নজরুল মেলার আয়োজন করা হয়। তবে স্মৃতিকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন নিদর্শন সংগ্রহ ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতি স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কিভাবে করা যায় সে প্রসঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক মাওলা প্রিন্স বলেন, কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ও স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঢাকাস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এবং ত্রিশালস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে যৌথভাবে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু দায়িত্ব দিলেই হবে না, কে বা কারা দায়িত্ব নিচ্ছেন, পরিচালনা করছেন, তিনি বা তারা আদৌ নজরুল অনুরাগী কিনা, দক্ষ ও আন্তরিক কিনা, তিনি বা তারা সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন কিনা ইত্যাদি বিষয়গুলো নিশ্চিত করে উদ্যোগ নিলে কার্যকর সুফল মিলবে। জাতীয় জীবনের বিকাশের লক্ষ্যে নজরুলচর্চায় যেমন বাজেট বাড়াতে হবে তেমনি বাজেটের সুষ্ঠু ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নজরুল স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো সর্বসাধারণের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসাবে দাঁড় করতে হবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ