প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
রুদ্র আল মুত্তাকিন
ঢাকা, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ : মানুষের জীবনকে কি ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? সম্ভব নয়, হয়তো! তবে কিছু স্থান ও কাল মানুষের জীবনের সঙ্গে এতটাই সম্পর্কিত থাকে যে, তাদেরকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় সেই মাটির কাছে। সেই ধুলো-মাটি, জল-হাওয়া, লোকজীবন এবং বিস্মৃত স্মৃতির কাছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বোঝার জন্যও এমন একটি ফিরে দেখা অপরিহার্য। বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ধূমকেতুর মতো। যাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, যাঁর কবিতায় প্রেম ও বিদ্রোহ পরস্পরকে আলিঙ্গন করেছিল—তাঁর জীবনেও রয়েছে কিছু ভৌগোলিক সফরের স্মৃতি, যাদের কথা বললে ইতিহাসের ‘গম্ভীর’ বয়ান কিছু সময়ের জন্য থেমে যায়, কান পাততে হয় মাটির নিজস্ব ভাষায়।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল এমন একটি স্থান যা কবি নজরুলের জীবনে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলেছে। এখানে নজরুল কবি হিসেবে আসেননি, বরং এসেছিলেন এক কিশোর হিসেবে। সামনে ছিল অনিশ্চিত জীবনের দীর্ঘপথ। ত্রিশালযাপনের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন। কে জানত যে এই কিশোরের নাম একদিন বাংলা ভাষার সবচেয়ে দুর্দম উচ্চারণগুলোর একটি হয়ে উঠবে! আজ এত বছর পর ‘ত্রিশালে নজরুলের স্মৃতির’ পথে হাঁটতে হাঁটতে তাই শুধু নজরুলের স্মৃতিচিহ্ন খুঁজলেই হবে না, খুঁজতে হবে সেই সময়ের সেই কিশোরের স্পন্দন, কিশোরের বেড়ে ওঠার অনুষঙ্গ, এবং ত্রিশাল কীভাবে ধারণ করে রেখেছে তার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অথচ বহুমাত্রিক অধ্যায়। কারণ, নজরুলকে ফিরে দেখা মানে কেবল একজন কবিকে স্মরণ করা নয়, বরং তার সময়কেও নতুন করে পাঠ করা।
কবি নিজেও বিভিন্ন বয়সে ত্রিশালের স্মৃতি স্মরণ করেছেন। তাঁর রচিত একটি গল্প ‘অগ্নিগিরি’ এর মাধ্যমে আমরা কিশোর নজরুলের ত্রিশাল ভ্রমণ সম্পর্কে জানব।
‘অগ্নিগিরি’ গল্পের পটভূমি ও বাস্তব ত্রিশাল:
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অগ্নিগিরি’ ছোটগল্পটির প্রেক্ষাপট হলো ত্রিশাল। গল্পটিতে সরাসরি উল্লেখ রয়েছে ‘ত্রিশালের মাদ্রাসা’, ‘গফরগাঁও-এর জমিদারের হাতি’ এবং ‘ময়মনসিংহের হাসপাতাল’-এর মতো বাস্তব উপাদান। নজরুল তাঁর এই গল্পে যে ‘বীররামপুর’ গ্রামের চিত্র এঁকেছেন, তা মূলত বাস্তব জীবনের ‘দরিরামপুর’ গ্রামকেই নির্দেশ করে।
বাস্তবতার সঙ্গে গল্পের এই মেলবন্ধন আরও স্পষ্ট হয় ভৌগোলিক অবস্থানের বর্ণনায়। নজরুল ত্রিশালে থাকাকালীন শেষপর্যন্ত নামাপাড়ার বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে জায়গির ছিলেন। এই বাড়ির ঠিক পাশের গ্রামটি হলো ছলিমপুর। ছলিমপুরের মানুষজন বিচ্যুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি পেরিয়ে এবং একটি বটগাছ অতিক্রম করে দরিরামপুর বাজারে যাতায়াত করতেন। এই বাস্তব ভৌগোলিক চিত্রটিই গল্পে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
কৈশোরের স্মৃতি ও নজরুলের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি:
ত্রিশালের মাটিতে পা রাখার সময় কাজী নজরুল ইসলামের বয়স ছিল চৌদ্দ কি পনেরোর কাছাকাছি। এই বয়সে পৃথিবীকে দেখার চোখ তৈরি হয়। নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু জীবন তখনো নজরুলের জন্য স্থির কোনো আশ্রয় সাজিয়ে রাখেনি। পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়ে আসা, নতুন মানুষের সংসারে জায়গা করে নেওয়া, এক আশ্রয় ছেড়ে অন্য আশ্রয়ে যাওয়া—এই ছিল তাঁর ত্রিশাল জীবনের বাস্তবতা। পরে যে মানুষটি বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের এক অনন্য ভাষা হয়ে উঠবেন, তাঁর কৈশোরের দিনগুলোতেও কি সেই স্বাধীনচেতা সত্তার কোনো আভাস ছিল?
প্রশ্নটি আরও কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে ওঠে নজরুলের ‘অগ্নিগিরি’ গল্পের কাছে গেলে। গল্পের চরিত্র, সম্পর্ক ও ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে কবির ত্রিশাল-জীবনের কিছু সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে উঠে এসেছে সবুর, নূরজাহান ও রুস্তমের প্রসঙ্গ। গল্পের ভেতরকার মানুষদের সঙ্গে নজরুলের বাস্তব জীবনের কোনো মানুষের মিল ছিল কি না, কিংবা কৈশোরের কোনো অভিজ্ঞতা গল্পের উপাদান হয়ে উঠেছিল কি না—এসব প্রশ্ন পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক শতাব্দীরও বেশি আগের ত্রিশালে।
নজরুল ১৯১৪ সালের জুনে দারোগা রফিজউল্লাহর সঙ্গে ত্রিশালে এসেছিলেন। ভর্তি হয়েছিলেন দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে, বর্তমানে যা নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত। শুরুতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল কাজীর শিমলা গ্রামে। সেখান থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন এই পথ হেঁটে যাতায়াত করতে হতো তাঁকে। পরে রফিজউল্লাহ তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন নামাপাড়া গ্রামের কাজী হামিদুল্লাহর বাড়িতে। সেখানেও বেশিদিন থাকা হয়নি তাঁর। এরপর আশ্রয় মেলে বিচ্যুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে, পুকুরের পাশে ছোট্ট একটি ঘরে।
এই বাড়ি বদলের ঘটনাগুলো নিছক জীবনী-তথ্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কিশোর বয়সে জায়গির থাকার অভিজ্ঞতা, নিজের ইচ্ছা ও অন্যের নিয়মের মধ্যে টানাপোড়েন, আর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যাওয়ার বাস্তবতা—এসবের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে মানুষের বেড়ে ওঠার গল্প। ‘অগ্নিগিরি’র সবুরের সঙ্গে নজরুলের জীবনের তুলনা টানতে গেলে এই অভিজ্ঞতার জায়গাটিই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কেননা সবুরের জীবনেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। তবে মিল থাকলেই যে চরিত্রটি কবির আত্মপ্রতিকৃতি, তা নিশ্চিত বলা যায় না।
ত্রিশাল তাই এখানে শুধু নজরুলের জীবনের একটি অধ্যায়ের নাম নয়। তাঁর কৈশোরের বাস্তবতা আর সাহিত্যের সম্ভাব্য অনুরণনকে পাশাপাশি রেখে দেখা যায়। ‘অগ্নিগিরি’ সেই দেখার একটি জানালা খুলে দেয়।
ত্রিশালের এই দিনগুলোতে একদিকে যেমন ছিল ময়মনসিংহের শ্যামল প্রকৃতি ও আতিথেয়তা, অন্যদিকে ছিল নিঃসঙ্গতা ও কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা। ‘ভিনদেশি’ কথনরীতির কারণে স্থানীয় বালকদের কাছে উত্ত্যক্ত হওয়া, কিংবা তাঁর প্রতিভা (গান গাওয়া, বাঁশি বাজানো, পরীক্ষায় প্রথম হওয়া) দেখে সহপাঠীদের ঈর্ষা করার মতো ঘটনাও তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
কৈশোরের সেই অম্লমধুর স্মৃতি নজরুল কখনো ভোলেননি। ১৯২৬ সালের গফরগাঁওয়ের প্রজা সম্মিলনীতে পাঠানো চিঠিতেও তিনি ময়মনসিংহের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর অশেষ ঋণ এবং শৈশবের উজ্জ্বল স্মৃতির কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। ‘অগ্নিগিরি’ গল্পের মাধ্যমে নজরুল তাঁর কিশোর বেলার সেই চেনা ভূমি, চেনা মানুষ আর ফেলে আসা দিনগুলোকেই সাহিত্যের পাতায় চিরদিনের জন্য অমর করে রেখে গেছেন।
এই প্রসঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক মাওলা প্রিন্স বলেন, ‘ত্রিশাল অধ্যায় বাদ দিয়ে নজরুলের জীবন বিচার করার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, তিনি ত্রিশালে এসেছিলেন 'মানুষ হতে' এবং ময়মনসিংহ জেলার কাছে তিনি 'অশেষ ঋণে ঋণী'। তাঁর জীবনে প্রথমত ত্রিশাল এবং দ্বিতীয়ত করাচি ছিল দূরদেশ ভ্রমণ বা অবলোকন। তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মে এই দুই অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষের সমাহার ঘটেছে। 'অগ্নিগিরি' ছোটগল্প, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁকে লেখা চিঠি ও গফরগাঁও নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মেলনে পাঠানো অভিভাষণে ত্রিশাল কেন্দ্রিক তাঁর স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও সাহিত্যিক সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।’
বর্তমানে ত্রিশালে নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণে করণীয়:
কবি নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণে ত্রিশালে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কাজীর শিমলায় দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়ি ও নামাপাড়ায় বিচ্যুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুটি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র। সেখানে কবির স্মারক, আলোকচিত্র ও বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কবির স্মৃতিবিজড়িত দরিরামপুর হাইস্কুল বর্তমানে নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত। ২০০৬ সালে ত্রিশালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। একই বছর বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে চালু হয় ‘নজরুল পর্যটন’ কর্মসূচি। এছাড়া প্রতিবছর কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নজরুল মেলার আয়োজন করা হয়। তবে স্মৃতিকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন নিদর্শন সংগ্রহ ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতি স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কিভাবে করা যায় সে প্রসঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক মাওলা প্রিন্স বলেন, কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ও স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঢাকাস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এবং ত্রিশালস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে যৌথভাবে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু দায়িত্ব দিলেই হবে না, কে বা কারা দায়িত্ব নিচ্ছেন, পরিচালনা করছেন, তিনি বা তারা আদৌ নজরুল অনুরাগী কিনা, দক্ষ ও আন্তরিক কিনা, তিনি বা তারা সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন কিনা ইত্যাদি বিষয়গুলো নিশ্চিত করে উদ্যোগ নিলে কার্যকর সুফল মিলবে। জাতীয় জীবনের বিকাশের লক্ষ্যে নজরুলচর্চায় যেমন বাজেট বাড়াতে হবে তেমনি বাজেটের সুষ্ঠু ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নজরুল স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো সর্বসাধারণের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসাবে দাঁড় করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন