০৭:১২ পি.এম
দেশের প্রথম চার লেনের ‘ক্যাবল-স্টেইড’ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর ওপর। সেতুর মূল কাঠামো উঁচু পাইলন বা স্তম্ভ থেকে টানা ইস্পাতের তারের সাহায্যে ধরে রাখা হবে। আধুনিক এই সেতু, যা দেখতে বীণার তারের মতো, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণ হয়ে উঠবে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর রাঙামাটির কাপ্তাই ও চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সংযোগস্থলে কর্ণফুলী নদীর চন্দ্রঘোনা-রাইখালী ফেরিঘাট এলাকায় সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ৫৩২ মিটার দীর্ঘ এই সেতু চালু হলে চন্দ্রঘোনা ফেরির ওপর নির্ভরশীল রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার মানুষের প্রায় চার দশকের ভোগান্তি কমবে।
সওজ সূত্র জানাচ্ছে, ১৯৮৯ সালে রাঙামাটির সঙ্গে রাজস্থলী ও বান্দরবান জেলার যোগাযোগ সহজ করতে কর্ণফুলী নদীতে রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনায় ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। ৩৭ বছর পরও কেবল একটি ফেরির মাধ্যমেই দুই পাড়ের শত শত যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। এই ফেরি ব্যবস্থাই বর্তমানে ভোগান্তির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পন্টুনের সমস্যা, ডুবোচর কিংবা নদীর তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে যাত্রী ও চালকদের দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নড়াইলে প্রকৌশলীর বাড়িতে ডাকাতি, কোটি টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ
সওজ রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা গণমাধ্যমকে জানান, সেতুটির মূল অংশের দৈর্ঘ্য হবে ৫৩২ মিটার, যা স্টিল ও কংক্রিটের সমন্বয়ে নির্মিত হবে। এতে ৪৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট এবং ১ হাজার ২৫০ মিটারের বেশি দীর্ঘ এলিভেটেড সড়ক থাকবে। এই চার লেনের সেতুতে আধুনিক ‘ব্রিজ স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’ যুক্ত করা হবে, যা সেতুর অবস্থা ও স্থায়িত্ব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। এছাড়া স্বয়ংক্রিয় টোল প্লাজা থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ক্যাবল-স্টেইড সেতুতে সেতুর সড়কপথের ভার মূল টাওয়ার বা পিলারের সঙ্গে যুক্ত তির্যক তারের মাধ্যমে বহন করা হয়। শক্তিশালী স্টিলের তারের সাহায্যে সেতুর ডেক বা চলাচলের পথ টাওয়ারের সঙ্গে যুক্ত থাকে। টাওয়ার, তার ও ডেক একসঙ্গে সেতুর ভার বহন করে, ফলে নদীর মাঝখানে পিলার নির্মাণের প্রয়োজন হয় না। এর ফলে বড় পরিসরের স্প্যান তৈরি করা সম্ভব হয়, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে না।
নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, রাঙামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর-১৬১) ২১তম কিলোমিটারে সেতুটি নির্মাণ করা হবে। এ জন্য ৭ দশমিক ৫২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেতুর চূড়ান্ত নকশা তৈরি করে প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন ডিপিপি পুনর্গঠন করে আবার পাঠাতে হবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে যান চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে ফেরিতে একবারে মাত্র ৮ থেকে ১০টি ট্রাক বা বাস এবং ১৫ থেকে ২০টি ছোট ও হালকা যানবাহন পারাপার করা যায়। একবার নদী পার হতে আধা ঘণ্টা, কখনো এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। কর্ণফুলী নদীতে স্রোত বাড়লে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের গেট খুলে দিলে কিংবা নদীতে পানি কমে গেলে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এতে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন: তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় বান্ধবী দিশা গ্রেফতার
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সেতুটি চালু হলে দীর্ঘদিনের ফেরি পারাপারের দুর্ভোগ কমবে। এর ফলে পর্যটন ও বাণিজ্যে গতি আসবে, কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।
চন্দ্রঘোনার ব্যবসায়ী ফরিদ আহমদ জানান, চন্দ্রঘোনা ফেরি দিয়ে দৈনিক ৯০০ থেকে ১ হাজার ছোট-বড় যানবাহন পারাপার হয়। তবে ফেরির কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে ছোট ছোট সাম্পানে নদী পার হন।
তিনি বলেন, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার কয়েক লাখ মানুষ চন্দ্রঘোনা ফেরির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্যও তিন পার্বত্য জেলা ঘুরে কক্সবাজার যাওয়ার এই পথটি বেশ জনপ্রিয়।
কাপ্তাইয়ের রাইখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা থোয়াই অং মারমা বলেন, ‘ফেরি অচল থাকলে আমরাও থেমে থাকি। দুই-তিন মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় লাগে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন জরুরি রোগীরা। রাত-বিরাতে অ্যাম্বুলেন্সকেও ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অথচ সেতু থাকলে কয়েক মিনিটেই নদী পার হওয়া যেত।’
আরও পড়ুন: এশিয়ান পেইন্টসের সহযোগিতায় আইএবি অ্যাওয়ার্ডসে ১০টি পুরস্কার প্রদান
রাইখালী বাজারের ব্যবসায়ী তনয় তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ফেরির ঝামেলায় পাহাড়ি এলাকার কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো যায় না। অনেক সময় ফেরি বিকল হয়ে মাঝনদীতে আটকে পড়ে। এই সেতু হলে বান্দরবান ও রাঙামাটির সঙ্গে ব্যবসার চেহারাটাই বদলে যাবে।
ট্রাকচালক রহিম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন ইট আনা-নেওয়ার কাজে তাকে এই ফেরি পার হতে হয়। কখনো এক ঘণ্টায় নদী পার হওয়া যায়, আবার কখনো দীর্ঘ যানজটে বসে থাকতে হয়। সেতুটি হলে সময়ের অপচয় ও জীবনের ঝুঁকি—দুটিই কমবে।
সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমা জানান, সেতুটি শুধু যাতায়াত সহজ করবে না, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ‘দুই পার্বত্য জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এই সেতু মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।’
আরও পড়ুন: মিরপুরে মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের গাড়িতে আগুন, সংঘর্ষের ঘটনা
কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, চন্দ্রঘোনায় সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং দুই জেলার আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাস্টার খলিলুর রহমান শেখ বলেন, সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য বান্দরবান, রাজস্থলী, চন্দ্রঘোনা, রাইখালী, রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাই এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন