০৭:১১ পি.এম
দুই ছেলের মৃত্যুর পর বড় ছেলের স্ত্রীও ক্যানসারে মারা গেছেন। তিনি রেখে গেছেন চার বছরের এতিম নাতি। সেই অবুঝ নাতিকে ভিক্ষা করে বড় করেছেন ৮৯ বছর বয়সী বৃদ্ধ হানেছ আলী ও ৭৯ বছর বয়সী সুফিয়া আক্তার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা এখন একাকী ও ন্যুব্জ। ঢাকার ধামরাই উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের দুনিগ্রামের এই বৃদ্ধ দম্পতির প্রতিদিনের লড়াই এখন কেবল দুমুঠো ভাতের জন্য।
আজ শনিবার দুনিগ্রামে ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় তাদের চরম দুর্দশার চিত্র। মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয় বলতে একটি ভাঙা ঘর। বেড়াগুলো ভাঙাচোরা, বিছানা ছেঁড়া। জরাজীর্ণ এই ভিটায় নেই কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই কোনো শৌচাগার। এমনকি এক ফোঁটা নিরাপদ খাবার পানির জন্য বাড়িতে একটি নলকূপও নেই। চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটছে এই অশীতিপর দম্পতির দিন ও রাত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝড়-বৃষ্টির রাতে ঘরের চালের টিনের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে ঘর ভেসে যায়। শীতের দিনে ভাঙা বাঁশ আর পাটখড়ির বেড়া ঠেকিয়ে রাখতে পারে না হিমেল হাওয়া। এই জরাজীর্ণ ও কষ্টকর পরিবেশেই দিন যাপন করছেন তারা।
আরও পড়ুন: দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় এমপি নজরুলের জামিন মেলেনি
আজ থেকে প্রায় ১৭ বছর আগে হানেছ আলীর সংসারের হাল ধরা বড় ছেলে জুলমত আলী বালু তোলার কাজ করতে গিয়ে নদীর তলদেশ থেকে আর ফিরে আসেননি। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই বড় ছেলের স্ত্রী আরেফা আক্তার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি রেখে যান চার বছরের শিশু আশিকুরকে। নিয়তির নির্মম পরিহাসে এর কিছুদিনের মধ্যে শ্বাসকষ্টে মারা যান ছোট ছেলে সোহরাব আলীও।
চোখের জল মুছতে মুছতে বৃদ্ধ হানেছ আলী বলেন, "দুইটা জোয়ান ছেলে চোখের সামনে চইলা গেল। বড় ছেলের বউডাও ক্যানসারে মরল। চার বছরের নাতিডারে নিয়া অথই সাগরে পড়ছিলাম। আল্লাহ তাও বাঁচায় রাখছে, কিন্তু এহন আর শরীর চলে না বাবা। একটু শান্তিতে ঘুমানোর একটা জায়গা চাই।"
বৃদ্ধা সুফিয়া আক্তার বলেন, "মাইনষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পেতে ভিক্ষা করে নাতিডারে বড় করছি। নিজেরা না খাইয়া তারে পড়ালেখা করাইছি। এহন আমরা বুড়া-বুড়ি ওর ওপর বোঝা হয়া আছি। একটা টিউবওয়েল নাই, মাইনষের বাড়ি থেইকা পানি আইনা খাইতে হয়। এই বয়সে আর কত কষ্ট করুম?"
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভিক্ষা করে, খেয়ে না-খেয়ে নাতি আশিকুরকে এইচএসসি পাস করিয়েছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। কিন্তু চরম অর্থকষ্টের কারণে তার পড়াশোনা আর এগোয়নি। আশিকুর এখন রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে দিনমজুরের কাজ করেন। দিনমজুরি করে যা পান, তা দিয়ে তিনজনের দুবেলা খাবারই ঠিকমতো জোটে না। টাকার অভাবে আশিকুর বিভিন্ন জায়গায় চাকরির পরীক্ষা দিয়েও কোনো সুরাহা করতে পারছেন না।
আরও পড়ুন: নড়াইলে প্রকৌশলীর বাড়িতে ডাকাতি, কোটি টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ
হানেছ আলীর একমাত্র মেয়ে জুলেখার বিয়ে হয়েছে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে। জুলেখা নিজে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে নিজের ৪ জনের সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে বৃদ্ধ বাবা-মাকে আর্থিক সাহায্য করার মতো সামর্থ্য তার নেই।
নাতি আশিকুর রহমান বলেন, "দাদা-দাদি অনেক কষ্ট করে আমাকে বড় করেছেন। টাকার অভাবে উচ্চশিক্ষা নিতে পারিনি। এখন দিনমজুরের কাজ করে যা পাই, তা দিয়ে দাদা-দাদীর মুখে দুবেলা অন্ন তুলে দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। পড়াশোনা করেও একটা ভালো চাকরি পাচ্ছি না। আমার আর কোনো চাওয়া নেই, শুধু দাদা-দাদীর জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় আর আমার একটা স্থায়ী চাকরি দরকার, যেন তাদের শেষ বয়সে একটু সুখে রাখতে পারি।"
নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই পরিবারটির পাশে মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীরা দাঁড়ালেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্থানীয় প্রতিবেশী ইয়ার হোসেন বলেন, "এই পরিবারটির দুঃখের কোনো শেষ নেই। চোখের সামনে একে একে সব শেষ হয়ে গেল। আমরা গ্রামবাসী সাধ্যমতো টুকটাক সাহায্য করি। কিন্তু তাদের একটা থাকার ঘর আর পানির ব্যবস্থা হওয়া খুব দরকার। সরকারের বা কোনো বিত্তবান মানুষের উচিত এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো।"
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম হাসান বলেন, "সমাজের অসহায়, দুস্থ এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষদের সহযোগিতার জন্যই সমাজসেবা কার্যালয় কাজ করে থাকে। এই বৃদ্ধ দম্পতির বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। তাদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার ব্যাপারে এবং জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কোনো স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে আমরা দ্রুত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।"
আরও পড়ুন: এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন পে স্কেলের সুখবর দিলেন শিক্ষামন্ত্রী
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন