০৪:৪৪ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে ডেঙ্গুর সংক্রমণ গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে মশার মাধ্যমে ছড়ানো ডেঙ্গুতে প্রায় ৩০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের অধিকাংশই ট্যাম্পা শহরের নিকটবর্তী হিলসবোরো কাউন্টির বাসিন্দা। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ওই এলাকা এবং আশপাশের কয়েকটি কাউন্টিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে এই তথ্য প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সীমিত তথ্য রয়েছে। তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য এবং চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্তত ১৯৪০-এর দশকের পর কোনো অঙ্গরাজ্যে এক বছরে এত বেশি স্থানীয় সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে সাধারণত ফ্লোরিডাতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। তবে ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ সংক্রমণের বছর ছিল। ওই বছর রাজ্যটিতে স্থানীয়ভাবে ছড়ানো ডেঙ্গুতে প্রায় ২০০ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন। এবার সেই সংখ্যাও ছাড়িয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য নয়, তবে দেশটির অধীন পুয়ের্তো রিকোতে নিয়মিত ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা সাধারণত ৫০টি অঙ্গরাজ্যের যেকোনোটির চেয়ে অনেক বেশি।
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে ট্যাম্পা এলাকায় দিন-রাত মশা মারার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়িঘর এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি পরীক্ষা করা হচ্ছে, যাতে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা যায়।
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার কামড়ে ছড়ায়। আক্রান্ত অনেকের কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে কারও কারও জ্বর, ফ্লুর মতো উপসর্গ এবং শরীর ও হাড়ে তীব্র ব্যথা হতে পারে। অসহনীয় ব্যথার কারণে রোগটি ‘হাড়ভাঙা জ্বর’ নামেও পরিচিত। গুরুতর অবস্থায় রক্তক্ষরণ, শারীরিকভাবে শক তৈরি হওয়া এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
চলতি বছর ফ্লোরিডায় ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর ট্যাম্পার এক বয়স্ক নারী মারা যান। হিলসবোরো কাউন্টির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কার্লা ফ্রাই জানিয়েছেন, ট্যাম্পা এলাকার কয়েকজন আক্রান্তকে জ্বর ও পানিশূন্যতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আতঙ্ক, তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন রয়েছে। প্রথমবার আক্রান্ত হলে শরীরে ওই ধরনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে আগের সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি সব সময় নতুন ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসের শরীরে প্রবেশ ও বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে কার্যকর টিকা তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্যাম্পা এলাকার অধিকাংশ মানুষের ডেঙ্গুর কোনো ধরনের বিরুদ্ধেই আগে থেকে প্রতিরোধক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছেন তুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেঙ্গুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডন ওয়েসন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু ছড়ানো মশার বিস্তৃতি বাড়ছে। আগে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে ডেঙ্গুর অধিকাংশ সংক্রমণ হতো বিদেশ ভ্রমণ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে। তবে ২০০৯ ও ২০১০ সালে ফ্লোরিডার কি ওয়েস্টে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়। ১৯৪৫ সালের পর টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে এটিই ছিল স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের প্রথম ঘটনা।
এরপর কোনো অঙ্গরাজ্যে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা যায় হাওয়াইয়ে। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ছয় মাসে সেখানে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গুতে ২৬৪ জন আক্রান্ত হন। এবার ট্যাম্পা এলাকার সংক্রমণ সেই সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুতে ২২ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এ বছর স্থানীয়ভাবে ছড়ানো ডেঙ্গুতে ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই পুয়ের্তো রিকোর বাসিন্দা।
আরও পড়ুন: বিলবোর্ডের ছবিকে রাস্তা ভেবে সজোরে ট্রাক চালালেন চালক, অতঃপর প্রাণ হারালেন
ফ্লোরিডায় সাধারণত মায়ামি অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। কিন্তু এবার ট্যাম্পা এলাকায় সংক্রমণ বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভ্রমণের ধরন পরিবর্তনের কারণে সংক্রমণ বাড়তে পারে।
গত সপ্তাহের হিসাব অনুযায়ী, ফ্লোরিডায় স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছেন ২৫২ জন, আর ভ্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের সংখ্যা ২৪৫। অর্থাৎ, স্থানীয়ভাবে ছড়ানো সংক্রমণ এবার ভ্রমণজনিত সংক্রমণকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে হিলসবোরো কাউন্টিতে অন্তত ১৩ জন ভ্রমণকারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফ্লোরিডার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ ছাড়া কেন্দ্রীয় সংস্থাটির রোগ তদন্তকারীরা সরাসরি সেখানে যেতে পারেন না। ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ এখনো তাঁদের আসার অনুরোধ জানায়নি। তবে রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগকে ৮ লাখ ডলার সহায়তা দিয়েছে সংস্থাটি। এ অর্থ জনসচেতনতা, পরীক্ষাগারের পরীক্ষা এবং মশা দমনের কাজে ব্যবহার করা হবে। ট্যাম্পা এলাকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সহায়তার অর্থ স্থানীয় পর্যায়ে এখনো পৌঁছায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় মশার কামড় থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকা জরুরি। দিনের যেকোনো সময় ডেঙ্গুবাহী মশা কামড়াতে পারে। তাই মশা প্রতিরোধক ব্যবহার, ঢিলেঢালা লম্বা হাতার পোশাক ও লম্বা প্যান্ট পরা এবং জানালায় জাল লাগানো ঘর বা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকা উপকারী। সূর্যোদয়ের পরপর এবং সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে মশার সক্রিয়তা বেশি থাকায় এ সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে
এছাড়া বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলতে হবে। পুরোনো টায়ারসহ যেসব স্থানে পানি জমে মশা বংশবিস্তার করতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ ডন ওয়েসনের আশঙ্কা, জলবায়ুর পরিবর্তন ও মশার স্থায়ী উপস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতিই ভবিষ্যতে নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে ওঠার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: এপি
আরও পড়ুন: লাইভ সম্প্রচারে প্রার্থনার সময় ক্রুশ পড়ে যাজক পাত্রিসিও আলফ্রেডো সানচেজ মোলিনারির মৃত্যু
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন