০৫:৩২ পি.এম
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমাগত নির্মাণাধীন বহু তলা ভবনে কাজ করতে গিয়ে গত কয়েক বছরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত তিন নির্মাণশ্রমিক। আহত হয়েছেন অনেকেই। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, সেই তদন্তের ফলাফল বা সুপারিশের বাস্তবায়নের তথ্য কোনোভাবেই প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে নির্মাণকাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে।
গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) নির্মাণাধীন ১০ তলা ইউটিলিটি ভবন-৪ এ কাজ করার সময় চাঁদপুরের বাসিন্দা রাসেল নিচে পড়ে মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।
এর আগে গত বছরের ২২ মার্চ নির্মাণাধীন আরেকটি ১০ তলা ভবনের ওপর থেকে পড়ে প্রাণ হারান মো. ইব্রাহিম, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা। সহকর্মীদের অভিযোগ ছিল, তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করানো হচ্ছিল।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
এছাড়া, ২০১৯ সালের ১৫ মে বিদ্রোহী হলের নির্মাণকাজ চলাকালে অষ্টম তলা থেকে পড়ে মারা যান ২০ বছর বয়সী শ্রমিক হাসান। ওই ঘটনার পরেও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু তার প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, প্রাণহানির পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই, একটি ছাত্র হলের নির্মাণাধীন বারান্দার ছাদ ধসে অন্তত ১০ শ্রমিক আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, দুর্বল সাপোর্ট ব্যবহারের কারণে ছাদ ধসে পড়ে। সেই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়নি।
সম্প্রতি নির্মাণাধীন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, অনেক শ্রমিক অনেক উঁচুতে নিরাপত্তা বেল্ট ছাড়া কাজ করছেন। কারোর মাথায় হেলমেট নেই এবং অনেকের পায়ে সেফটি বুটও নেই। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান তদারকির অভাব দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং শ্রম আইন অনুযায়ী, নির্মাণশ্রমিকদের হেলমেট, সেফটি বুট, গ্লাভস, গগলস এবং সেফটি বেল্ট ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। বিশেষভাবে দুই মিটারের বেশি উচ্চতার কাজের সময় নিরাপত্তা বেল্ট ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। নিরাপদ মাচা, সুরক্ষা জাল এবং নিরাপত্তা রেলিং রাখার বিধানও রয়েছে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি কিছুটা ভিন্ন। এনএস এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার ওয়াশিম জানান, শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়ার দাবি করেছেন, কিন্তু ভবনের আভ্যন্তরীণ শেষ পর্যায়ের কাজে অনেকে নিজেরা সেফটি বেল্ট ব্যবহার করছেন না।
ইউটিলিটি ভবন-৪–এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান খান অ্যান্ড সন্স বিডি লিমিটেডের প্রকৌশলী জসিম বলেন, নিহত শ্রমিককে সেফটি বেল্ট দেওয়া হয়েছিল, তবে তিনি সেটি ব্যবহার করেননি। এ তথ্য তারা তার সহকারী শ্রমিকের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। তবে সেই সহকারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মোফাছিরুল ইসলাম বলেন, প্রকৌশলীরা নিয়মিত কাজ তদারকি করেন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা বিধি মানতে বলেছিলেন। তার দাবি, অনেক সময় শ্রমিকরাই নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে আগ্রহী হন না।
পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তদন্তে যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যথেষ্ট নয়, নিহত শ্রমিকের পরিবারের দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
একের পর এক দুর্ঘটনা, তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংক্রান্ত দৃশ্যমান ঘাটতি—এসব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান নির্মাণকাজে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন