প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষে স্পেনের কিশোর তারকা লামিন ইয়ামালের উচ্ছ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ছিল মেসির মুখে। তিনি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ভাবে উপস্থিত ছিলেন।
নিউইয়র্ক নিউজার্সি স্টেডিয়ামে জড়ো হওয়া আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা যেভাবে তার নাম ধরে গান গাইছিল, মেসি তখন গভীর দৃষ্টিতে দীর্ঘক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
হয়তো তখন তার মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপে এমন ভালোবাসা পাওয়ার এটাই শেষ মুহূর্ত।
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি, যিনি মেসির মতোই টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের চেষ্টা করেছিলেন, টুর্নামেন্টে কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড মেসির এটাই শেষ ম্যাচ কিনা, সে প্রশ্নে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
একই সঙ্গে ডিসেম্বর মাসে তার মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছিলেন তিনি।
স্কালোনি বলেন, তিনি মেসির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেননি। এরপর তিনি নিজেই কাঁদতে শুরু করেন এবং সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে চলে যান।
সাধারণত বয়স বাড়লে ফুটবলারদের খেলার মান পড়ে যায়। কিন্তু সেরা খেলোয়াড়রা নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন।
মেসি অবশ্য কেবল মানিয়ে নেননি। তিনি খেলাটিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন যাতে তার বয়স বা গতির অভাব বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনায় অভিষেকের পর থেকে মেসি অন্তত পাঁচবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। আজকের আর্জেন্টিনা এবং ইন্টার মায়ামির মেসি সেই দীর্ঘ পরিবর্তনেরই ফল।
৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলতে নেমে তিনি তার পায়ের জাদু দেখিয়ে মুগ্ধ করেছেন পৃথিবীর ফুটবল প্রেমীদের।
কিন্তু গতরাতের ফাইনালের পর মনে হতে পারে যে মেসির অবিস্মরণীয় বিশ্বকাপ যুগের অবসান ঘটতে চলেছে এবার - তবে শেষ ম্যাচে যেন মনে হল তার নিজ দলই তাকে প্রতারণা করেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক মনোভাবের মাশুল গুনেছেন মেসি ও তার দল।
ফলস্বরূপ, শিরোপা ছাড়া বিশ্বমঞ্চে নিজের সম্ভাব্য শেষ ম্যাচটি খেলেছেন আর্জেন্টাইন মহানায়ক।
ভুল কৌশলে খেলা
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ও মারমুখী মনোভাব মেসির খেলায় কোনো সাহায্য তো করেইনি, বরং উল্টো ওই কৌশল আর্জেন্টিনা দলের প্রধান অনুপ্রেরণা ও দলনেতাকে ম্যাচের বেশিরভাগ সময় কার্যত একজন নিষ্ক্রিয় দর্শক বানিয়ে রেখেছিল। স্পেনের এই জয়টি ছিল মূলত ফুটবলের জয়।
কারণ পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার পুরো মনোযোগ ফুটবল বাদে অন্য সবকিছুর দিকে ছিল বলে মনে হচ্ছিল।
ম্যাচের শুরুর দিকে স্লোভেনিয়ান রেফারি স্লাভকো ভিন্সিক এমন শিথিলতা দেখান, যা পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে প্রতিপক্ষ দলগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে।
দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি মারাত্মক ফাউলের পরও তাকে কেবল মৃদু সতর্ক করে ছেড়ে দেয়া হয়।
এর প্রতিবাদে স্পেনের সমর্থকেরা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যাঙ্গাত্মক স্লোগান দিতে শুরু করেন।
এটি মূলত সেইসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে টুর্নামেন্টের কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্বের কারণেই আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ এত সহজ হয়েছে।
খেলোয়াড়দের আক্রমণাত্মক আচরণ
আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেস মিকেল ওয়ারজাবালকে ফাউল করার জন্য ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড পাওয়ার আগে ম্যাচের ৪০ মিনিট কেটে গিয়েছিল - যা এই বিশাল স্টেডিয়ামে থাকা অনেকের কাছে ছিল এক চরম বিদ্রূপের বিষয়।
আর্জেন্টিনার স্পষ্ট প্রতিভা, যা তারা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করে দেখিয়েছিল, তা এভাবে নষ্ট করার কৌশলে নেমে আসতে দেখাটা ছিল হতাশাজনক দৃশ্য - যা কোনোভাবেই মেসির প্রতিভা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য সহায়ক ছিল না। মেসি নিজেও এক পর্যায়ে এতে জড়িয়ে পড়েন।
স্পেনের মার্ক কুকুরেয়াকে বহিষ্কার করার জন্য তিনি রেফারিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন, কারণ কুকুরেয়া মুখের ওপর হাত রেখে কথা বলছিলেন।
এই বিশ্বকাপে যদি কোনো খেলোয়াড় আক্রমণাত্মকভাবে এই কাজটি করেন, তবে তা লাল কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ।
এর ঠিক আগে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সের সবচেয়ে নিম্নমুখী মুহূর্তটি আসে, যখন খেলা অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার ঠিক আগে এনজো ফার্নান্দেজ কোনো কারণ ছাড়াই কুবারসির ওপর চড়াও হন।
চেলসি মিডফিল্ডার যখন তার প্রতিপক্ষকে মাটিতে আছড়ে ফেলেন, তখন তিনি বলের দিকেও তাকাচ্ছিলেন না। তার দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পাওয়াটা পুরোপুরি যৌক্তিক ছিল।
৯০ মিনিটে কোনো শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা প্রথম দল হিসেবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো শট নিতে পারেনি।
আর ম্যাচের ১১৭তম মিনিটে তীব্র হতাশার মধ্যে যখন তারা শট নেয়ার সুযোগ পায়, তখন মেসির নেয়া শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
স্পেনের অন টার্গেট শট ছিল ১২টি। আর্জেন্টিনার ছিল শূন্য। হতবাক করা প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে যত পাস দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ফাউল করেছে।
পাসের সংখ্যা যেখানে ছিল আটটি, ফাউল ছিল নয়টি। এটাই ফাইনাল ম্যাচে তাদের খেলার ধরনকে ফুটিয়ে তুলেছিল।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মেসির সাথে কাঁদছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা দুই দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি অশোভন হাতাহাতি শুরু হয় কিছুক্ষণের মধ্যেই।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার পর লেয়ান্দ্রো পারেদেস - নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে - আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেন এবং এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন।
এরপর স্পেনের গাভিকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাতেও তিনি জড়িত ছিলেন।
এই অসাধারণ বিশ্বকাপকে এমন একটি অপ্রীতিকর সমাপ্তির জন্য মনে রাখা উচিত হবে না।
বিশ্বকাপ ফাইনালে যা বিশ্বমঞ্চে মেসির ৩৪তম ম্যাচ, এরপর ধরে নেয়া হচ্ছে তিনি হয়ত পরের বিশ্বকাপে আর নাও খেলতে পারেন।
তবে, এ কথা মানতেই হবে যে এই আর্জেন্টাইন জাদুকর ফুটবল পিচে পা রাখা সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
ফিল ম্যাকনালটি/প্রধান ফুটবল বিষয়ক লেখক
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন