০৪:৪১ এম
প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা চার হাজারের বেশি। খাবারের অভাব, রোগব্যাধি এবং চিকিৎসার অভাবে এসব কুকুরের দুর্ভোগ ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, দ্বীপের কুকুরগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা এবং পরিচর্যার উদ্দেশ্যে কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম স্থায়ী কুকুর আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নির্মিত এই আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ কুকুরের চিকিৎসার পাশাপাশি বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রমও চলছে। এই উদ্যোগে সহায়তা করছেন জার্মানি ও পেরুর দুই তরুণী।
জার্মানি থেকে মানবিকতার টানে সেন্টমার্টিনে এসেছেন জলপিয়া। তার সঙ্গে আছেন পেরুর জেসিকা মারিয়া। তারা আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ ও বিপন্ন কুকুরগুলোর খাবার, চিকিৎসা এবং পরিচর্যায় নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের লক্ষ্য, কেবল অসুস্থ কুকুরের চিকিৎসা নয়, বরং দ্বীপে কুকুরের অনিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রাণীগুলোর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা চার হাজারের বেশি। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক কুকুরের জন্য পর্যাপ্ত খাবার এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এর ফলে অনেক কুকুর অপুষ্টি এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসার অভাবে কিছু কুকুর প্রাণও হারাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সীমিত সামর্থ্যের কারণে এত বিপুলসংখ্যক প্রাণীর দায়িত্ব নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: নোয়াখালীতে ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির আনন্দ শোভাযাত্রা ও সমাবেশ
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্রটিতে কুকুরের খাবার ও চিকিৎসার পাশাপাশি বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে বন্ধ্যাকরণ করা গেলে কুকুরের অনিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধি কমবে। এতে ভবিষ্যতে খাবার ও চিকিৎসার সংকট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
পেরুর জেসিকা মারিয়া বলেন, "একটি স্ত্রী কুকুর বছরে একাধিকবার বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে কুকুরের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এ কারণে বন্ধ্যাকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" তিনি আরও বলেন, "অনেক কুকুরের শরীরে টিউমার ও চর্মরোগ দেখা যাচ্ছে। এসব রোগের কারণে প্রাণীগুলো প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে। তাদের দুর্ভোগ কমাতে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।"
জার্মানির জলপিয়া জানান, রাস্তা থেকে অসুস্থ কুকুর উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে। সেখানে তাদের সুস্থ করে তোলার চেষ্টা চলছে। কিছু কুকুরের বন্ধ্যাকরণও করা হচ্ছে, যাতে ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আসে। তার মতে, কুকুরের সংখ্যা কমলে তাদের খাবার, চিকিৎসা এবং অন্যান্য দুর্ভোগও কমানো সম্ভব হবে।
জলপিয়া আরও বলেন, "আগে দ্বীপে কুকুরের সংখ্যা আরও বেশি ছিল বলে আমি শুনেছি। এত বেশি কুকুরের কারণে তাদের নানা ধরনের কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এখন ধাপে ধাপে বন্ধ্যাকরণ ও চিকিৎসার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা চলছে। তবে অসুস্থ কুকুরের সংখ্যা দেখে আমার খারাপ লাগে। একসঙ্গে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও একেকটি কুকুরকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।"
আরও পড়ুন: ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল, সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর মনোনীত
আশ্রয়কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কিশোর কুমার দাশ। তিনি বলেন, "সেন্ট মার্টিনে এসে কুকুরগুলোর অবহেলিত অবস্থা এবং কয়েকটি কুকুরকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা আমাকে ব্যথিত করে। তখনই দ্বীপের কুকুরগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি।"
কিশোর কুমার দাশ বলেন, "কুকুরদের নিয়ে অনেকেই কথা বলেন, কেউ কেউ এ বিষয়কে কেন্দ্র করে ব্যবসাও করেন। কিন্তু প্রাণীগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায় না। শুধুমাত্র সাময়িক খাবার বা চিকিৎসা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কুকুরগুলোর জন্য স্থায়ী ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।"
তিনি আরও বলেন, "দ্বীপের প্রকৃতি, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। কুকুরগুলোর নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে তাদের দুর্ভোগ কমাতে কাজ করতে চাই।"
আশ্রয়কেন্দ্রটিতে রয়েছে ২০টি শেল্টার। প্রতিটি শেল্টারে ১২টি করে কুকুর রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কুকুরের চিকিৎসা এবং সার্বিক পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছেন দুই চিকিৎসক।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে উসকানির অভিযোগে ছাত্রলীগ-শ্রমিক লীগের ৩০ নেতাকর্মী গ্রেফতার
উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, আশ্রয়কেন্দ্রটির মাধ্যমে সেন্ট মার্টিনের বেওয়ারিশ কুকুরগুলোর দুর্ভোগ কমবে। পাশাপাশি পরিকল্পিত চিকিৎসা এবং বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থানের একটি মানবিক দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন