১১:৪৭ এম
স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের একটি ম্যাচে গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে টেনেরিফের ৩০ বছর বয়সী স্ট্রাইকার হেসুস দে মিগেলের মৃত্যু ঘটেছে, যা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে স্পেনের কর্তৃপক্ষ। গত সোমবার (২ নভেম্বর) ম্যাচ চলাকালে গোলরক্ষক হেসুস ওওনোর সঙ্গে সংঘর্ষের পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় ক্রীড়া-সংক্রান্ত শাস্তির পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা হতে পারে ইকুয়েটোরিয়াল গিনির এই গোলরক্ষকের বিরুদ্ধে।
এল পাইস–এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনিচ্ছাকৃত হত্যার সম্ভাব্য অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে স্পেনের জাতীয় পুলিশ। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের হাইকোর্ট জানিয়েছে, অস্বাভাবিক কারণে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত করা বাধ্যতামূলক। তবে এর মানে এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ফুটবলারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনা হয়েছে।
স্পেনের দণ্ডবিধির ১৪২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গুরুতর অবহেলার কারণে অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর ঘটনায় এক থেকে চার বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তুলনামূলক কম গুরুতর অবহেলার ক্ষেত্রে তিন থেকে ১৮ মাসের শাস্তির বিধান রয়েছে।
আরও পড়ুন: ক্লাবে ব্রাত্য হয়েও আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে ডাক পেলেন ডিফেন্ডার অ্যারন আনসেলমিনো
তবে তদন্ত শুরু হওয়া মানেই গোলরক্ষককে অভিযুক্ত করা হবে কিংবা দোষী সাব্যস্ত করা হবে, এমন নয়। ফৌজদারি দায় নির্ধারণের জন্য প্রমাণ করতে হবে যে তার আচরণে আইনগতভাবে প্রাসঙ্গিক অবহেলা ছিল এবং সেই পরিণতি আগে থেকে অনুমান করা ও এড়ানো সম্ভব ছিল কি না।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, এই ঘটনার পরিণতি কী হতে পারে, তা এখনই অনুমান করা কঠিন। কারণ স্পেনে কোনো সংস্পর্শভিত্তিক খেলায় দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষের কারণে একজন ফুটবলারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হওয়ার নজির নেই।
কী শাস্তি হতে পারে গোলরক্ষক ওওনোর?
ক্রীড়াগত শাস্তির ক্ষেত্রে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের শৃঙ্খলাবিধির ১০২ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, খেলা চলাকালে সহিংস আচরণের কারণে গুরুতর চোটের ঘটনা ঘটলে চার থেকে ১২ ম্যাচ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন: মোস্তাফিজ প্রথমবার বিগ ব্যাশে, খেলবেন মেলবোর্ন রেনেগেডসের হয়ে
ওই ম্যাচে গোলরক্ষক ওওনো লাল কার্ড দেখেছিলেন। ফলে তার বিরুদ্ধে এই ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের ওপর।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনার ভয়াবহ পরিণতির কারণে ২৫ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক সর্বোচ্চ ১২ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পেতে পারেন। তবে প্রতিপক্ষের মৃত্যুর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান নেই। ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি ও গোলরক্ষকের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
গোলরক্ষকের সম্ভাব্য শাস্তি নিয়ে আইনজীবীর বক্তব্য?
ক্রীড়া আইন বিশেষজ্ঞ মারিয়ানা গালভান ‘এস্তুডিও ফুটবল’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ওওনোর সম্ভাব্য শাস্তি নিয়ে কথা বলেছেন।
আরও পড়ুন: বার্সেলোনার চ্যাম্পিয়নস লিগে রাফিনিয়ার জোড়া গোলে ৩-০ জয়
তিনি বলেন, ‘এখানে তদন্তের তিনটি দিক রয়েছে, ক্রীড়াগত, ফৌজদারি এবং শ্রম আইনসংক্রান্ত। এর মধ্যে ফৌজদারি বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুতর। ওওনোর পক্ষে একটি বিষয় রয়েছে, সেটি হলো সংঘর্ষের সময় বলটি খেলার মধ্যে ছিল। তবে এখনই এটিকে দুর্ঘটনা বলা যাচ্ছে না। গোলরক্ষকের কর্মকাণ্ড এবং ক্রীড়াগত দিকটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাই হোক, তদন্ত শুরু হয়েছে এবং নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে গোলরক্ষককে আদালতে হাজির হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের মৃত্যুর কোনো পূর্ববর্তী নজির নেই। এমন পরিস্থিতিতে আইএফএবের (আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড) বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত এবং এ ধরনের ঘটনার শাস্তি আরও কঠোর করা উচিত। ফুটবলাররা অনেক সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষা পান না। মাথায় আঘাত একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারে, আর এই ঘটনায় তা কেড়ে নিয়েছে একটি জীবন।’
গালভান আরও ব্যাখ্যা করেন, ‘ফৌজদারি আইনে যেটিকে আমরা অবহেলা বলি, ফুটবলের ক্ষেত্রে সেটিকে বেপরোয়া আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা সামান্য হোক কিংবা গুরুতর। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের একজন বিচারক ঘটনাটিকে সামান্য বেপরোয়া আচরণ হিসেবে দেখতে পারেন, কারণ তার বিবেচনায় এটি খেলার স্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যেই ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর কারণ কী ছিল, তা নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপরই ক্রীড়াগত শাস্তি এবং পরবর্তী নৈতিক মূল্যায়ন নির্ভর করবে।’
যেভাবে ঘটেছিল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা:
আরও পড়ুন: ইতিহাসে কখনো হয়নি, এমন ২ রেকর্ড পিএসজি ভাঙল ৬ গোল করে
হেলিওদোরো রদ্রিগেজ লোপেজ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচের ৯৭তম মিনিটে ঘটে এই দুর্ঘটনা। বলের দখল নিতে গোলপোস্ট ছেড়ে এগিয়ে আসেন ওওনো। এ সময় টেনেরিফের স্ট্রাইকার দে মিগেলের সঙ্গে তার ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের পর মাঠেই হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় দে মিগেলের। চিকিৎসকেরা তাৎক্ষণিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে তার হৃদ্স্পন্দন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু পরদিন সকালে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন এই ফুটবলার।
ঘটনার পর রেফারি ওওনোকে লাল কার্ড দেখান এবং ম্যাচটি স্থগিত ঘোষণা করেন।
এদিকে পুরো ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ২৫ বছর বয়সী ইকুয়েটোরিয়াল গিনির গোলরক্ষক। দিয়ারি ডি'আন্দোরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সতীর্থদের সঙ্গে ড্রেসিংরুমে রাত কাটানোর সময় কেঁদেছেন এবং প্রার্থনা করেছেন তিনি। দে মিগেলের শারীরিক অবস্থার খবর পাওয়ার জন্য উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছিলেন।
আরও পড়ুন: পিএসজির গোল উৎসব, বার্সেলোনা ও ইন্টার মিলানের বড় জয়
এ ছাড়া স্পোর্ত জানিয়েছে, নিহত ফুটবলারের পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ওওনো।
মর্মান্তিক এই ঘটনার পর এখন তদন্ত ও শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে স্প্যানিশ ফুটবল।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন