০৩:৩৩ পি.এম
গাজীপুরের কালিয়াকৈরসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলগুলোতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের এক দফা দাবিতে চরম আকার ধারণ করেছে। টানা বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধের প্রেক্ষাপটে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং শ্রমিকদের সুরক্ষার স্বার্থে কালিয়াকৈর ও আশপাশের অঞ্চলের অর্ধশতাধিক তৈরি পোশাক কারখানা মালিকপক্ষ তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো শিল্পাঞ্চলে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। শ্রমিকদের ক্ষোভের পাশাপাশি মালিকদের আতঙ্কও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আর এর মাঝে রাস্তায় আটকে থাকা হাজার হাজার যাত্রী। ফলে পুরো মহাসড়ক যেন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল নয়টার দিকে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকা থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন মুহূর্তের মধ্যে চন্দ্রা, মৌচাক, কোনাবাড়ী ও তেলিচালাসহ পুরো শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: মিরপুরে কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে যুবক দগ্ধ
নাওজোড় এলাকায় প্যানিসিয়া লিমিটেডসহ কয়েকটি কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক একযোগে বেরিয়ে এসে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উড়ালসড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থান নেন। আন্দোলনকারীরা হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় বাঁশ ও গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী এবং উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী সব যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং দূরপাল্লার বাসসহ হাজার হাজার যানবাহন আটকা পড়ে সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই পাশে হাজার হাজার শ্রমিক পায়ে হেঁটে মিছিল করছেন। একপাশে সম্পূর্ণ রাস্তা জুড়ে মানুষের ঢল, অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও প্রাইভেটকার। বাসের ভেতরে বসে থাকা নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ পানির জন্য আকুতি জানাচ্ছেন, কেউ খাবারের খোঁজ করছেন, আবার কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (২ নভেম্বর) একই এলাকায় শ্রমিকেরা আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সেই সময় পুলিশের একাধিক গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, কারখানার গুদামে হামলা ও ভাঙচুরের মতো মারাত্মক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সংঘাত চলাকালে পুলিশ ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। সোমবারের আগুনের আতঙ্ক এখনও এলাকার মানুষের মনে তাজা রয়েছে।
আরও পড়ুন: সচিবালয়ে আইডি কার্ড দৃশ্যমান রাখা বাধ্যতামূলক করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
এই কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কারখানার মালিকরা ভয়ে ছিলেন, শ্রমিকেরা ক্ষোভে, আর পুলিশ ছিল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের একমাত্র দাবি হল- ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে।
এক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ভাই, বাজারে চালের দাম কত জানেন? বাসা ভাড়া কত? একটা ডিমের দাম কত? বর্তমান বেতনে ১০ দিনও সংসার চলে না। বাকি ২০ দিন ধার করে চলতে হয়। আমরা বিলাসিতা চাই না, আমরা শুধু বাঁচতে চাই।"
আরেক নারী শ্রমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "আমার দুটো বাচ্চা, স্বামী অসুস্থ। আমি একা কাজ করি। বেতন দিয়ে বাসা ভাড়া দেব, নাকি বাচ্চাদের খাওয়াব, নাকি ওষুধ কিনব? আমাদের কথা কেউ শোনে না। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছি।"
আরও পড়ুন: ঢাকায় তিন দিনের সফরে এলেন চীনা মন্ত্রী লিউ হাইশিং
শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, বিনা নোটিশে ছাঁটাই আর ব্ল্যাকলিস্টের ভয়ে তাঁরা কথা বলতে পারেন না। কেউ ন্যায্য দাবি তুললেই তাঁকে ছাঁটাই করে অন্য কোনো কারখানায় চাকরি না পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে মহাসড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সাধারণ যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন। ঢাকাগামী এক যাত্রী বলেন, "সকাল ৯টা থেকে বাসে বসে আছি। ৩ ঘণ্টায় ২ কিলোমিটারও যেতে পারিনি। বাচ্চাটা ক্ষুধায় কাঁদছে, সঙ্গে থাকা পানিও শেষ হয়ে গেছে।"
অন্য এক রোগীর স্বজন বলেন, "আমার মাকে নিয়ে ঢাকার হাসপাতালে যাচ্ছিলাম। কিন্তু রাস্তায় আটকে আছি। ডাক্তার বলেছেন দেরি হলে বিপদ হতে পারে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।"
চন্দ্রা থেকে ভোগড়া বাইপাস পর্যন্ত এলাকা জুড়ে বিশাল এলাকা যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে। শত শত বাস, কাভার্ডভ্যান ও ব্যক্তিগত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে। অনেক যাত্রী গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওনা হন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের উদ্যোগে একাডেমিক নিরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত
মাঠে বিজিবি, পুলিশ ও যৌথবাহিনী:
মঙ্গলবারের পরিস্থিতি মোকাবেলায় কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় থমথমে ভাব বিরাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ও শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সড়কজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বিজিবি, পুলিশ ও যৌথবাহিনীর সদস্যরা।
পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদেরও অবস্থান নিতে দেখা গেছে। তাঁরা শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, কিছু এলাকায় আজও শ্রমিক আন্দোলন চললেও নাওজোড়সহ বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। আন্দোলনরত শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: তাঁতিদল নেতা হুমায়ুন কবির হত্যা মামলার আসামি ফায়েক ঢাকায় গ্রেপ্তার
পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে- শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু মহাসড়ক বন্ধ করে, ভাঙচুর চালিয়ে ও আগুন দিয়ে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত টানা তিন দিনের ছুটির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় কারখানা সচল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এক কারখানা মালিক বলেন, "আমরা চাই না কোনো শ্রমিকের গায়ে আঘাত লাগুক। কারখানার মেশিনের চেয়ে শ্রমিকের জীবনের দাম অনেক বেশি। তাই আপাতত ছুটি দেওয়া হয়েছে।"
তবে এই ছুটির সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ছে বলে জানা গেছে। অনেক শ্রমিক মনে করছেন, ছুটি দিয়ে তাঁদের আন্দোলন দমানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ঝালকাঠিতে যুবক হত্যার প্রধান আসামি শাহজাহান গ্রেফতার
কালিয়াকৈর দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানে লাখ লাখ শ্রমিকের ঘামে চলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। এই শিল্প বন্ধ হলে ক্ষতি হবে সবার- শ্রমিকের, মালিকের এবং পুরো দেশের।
সাধারণ মানুষের দাবি হল- শ্রমিকের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া হোক, তবে রাস্তায় আগুন বা ভাঙচুর নয়, আলোচনার টেবিলেই আসুক সমাধান। শ্রমিক ফিরুক কারখানায়, যাত্রী ফিরুক নিরাপদে বাড়িতে, আর চাকা ঘুরুক মহাসড়কে। আগামী ৩ দিন পরিস্থিতি কেমন যায়, তা এখন নির্ভর করছে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন