০৮:৩৪ পি.এম
মহারশি নদী ভাঙন প্রতিরোধে নদীর পুনঃখনন ও বাঁধ নির্মাণের দাবিতে সক্রিয় হয়েছে স্থানীয়রা। প্রতি বছর পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের কারণে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে যায় এবং নদীর নাব্যতার সংকট দেখা যায়, যার ফলে বন্যার সৃষ্টি হয়। মহারশি নদীর ভাঙনে সৃষ্ট বন্যায় গত এক দশকে কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক পরিবার তাদের বাড়ি-ঘর হারিয়েছে। তাই স্থানীয়রা মহারশি নদীর পুনঃখনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের জন্য জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম ও দক্ষিণ গারো পাহাড়ি এলাকা থেকে মহারশি নদী নির্গমন করে ঝিনাইগাতী উপজেলার গারোকোনা এলাকার ১ হাজার ১০৮ নম্বর পিলারের পাশ দিয়ে জিরো পয়েন্টে প্রবেশ করে পাগলারমুখ এলাকায় মালিঝি নদীতে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া নদীটির পরিচিতি নম্বর ৬৮ এবং এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার ও গড় প্রশস্ততা ৫৭ মিটার। প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর বর্ষাকালে মহারশি নদীর গতিপথে ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ও ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের কমপক্ষে দশটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়।
গত ২০২৪ সালের অক্টোবর ও ২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাহাড়ি ঢল এবং অতিবৃষ্টির কারণে মহারশি নদীর উভয় তীরের বাঁধ ভেঙে যায়। এর ফলে ঝিনাইগাতী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, পাশাপাশি বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছে। দুর্গত এলাকায় ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর মহারশি নদীর দুই পাড়ে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি আয়োজন করেছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ভয়েস অব ঝিনাইগাতী’। এরপর জনপ্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, মানবাধিকার কর্মী সহ বিভিন্ন শ্রেণির ৩ হাজার ২৭৩ জন নাগরিকের স্বাক্ষর সংবলিত স্মারকলিপি তৎকালীন জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমানের মাধ্যমে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর জমা দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র অনুযায়ী, মহারশি নদীর দুই পাড়ে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবিতে গণস্বাক্ষরের স্মারকলিপি গত ২৩ অক্টোবর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক বরাবর মহারশি নদীর দুই পাড়ে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বন্যার পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহারশি নদীর দুই তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত ও পুনর্বাসন এবং নদী পুনঃখননের জন্য গত ২৫ নভেম্বর শেরপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সুদীপ্ত চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক পত্রে প্রায় ৪৮ কোটি ৬৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা ব্যয়ের একটি প্রস্তাবনা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় কারিগরি কমিটি গঠন করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত ও পুনর্বাসনের জন্য আনুমানিক ২২ কোটি ২৯ লাখ ২ হাজার টাকা এবং ১৭ কিলোমিটার মহারশি নদী পুনঃখননের জন্য প্রায় ২৬ কোটি ৩৫ লাখ ২১ হাজার টাকা ব্যয়ে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটি ৬৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা। পরবর্তী সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে গঠিত কারিগরি কমিটি চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। মহারশি নদীর দুই তীরে স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং নদী পুনঃখননের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন শাখা থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
খৈলকুড়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. বিনামিন বলেন, গত ২০২৪ সালের অক্টোবরের সময় মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার চোখের সামনে তিলে তিলে গড়া মুরগীর খামার ও বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে ওই সময় প্রায় ৩০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে, এখন পুঁজির অভাবে আর ব্যবসা দাঁড় করাতে পারছি না। এ ধরনের পরিস্থিতি যেন অন্য কেউ না হয়, তাই সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ও ঝিনাইগাতী বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের কোষাধ্যক্ষ মো. জাহিদুল হক মনির বলেন, মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে প্রতিবছর ঝিনাইগাতী সদর বাজারসহ আশপাশের অনেক এলাকা প্লাবিত হয়। এতে মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এ ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে নদীর দুই পাড়ে স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং নদী পুনঃখননের বিকল্প নেই। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতির সুরক্ষা নিশ্চিত হবে এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার নদী ভাঙন প্রবণ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হবে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
শেরপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সুদীপ্ত চৌধুরী বলেন, মহারশি নদীর দুই তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত ও পুনর্বাসন এবং নদী পুনঃখননের নকশা প্রস্তুতির কাজ চলমান রয়েছে। নকশা প্রস্তুত হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণের পর একনেক সভায় অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করা হবে। শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, এ বিষয়ে সংসদে একাধিকবার কথা বলেছি। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে এ কাজের অনুমোদন হয়ে যাবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন