০৫:০৫ পি.এম
দেশে শিং মাছ চাষ এর জনপ্রিয়তা এবং লাভজনকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খেতে সুস্বাদু এবং সহজপাচ্যসহ উচ্চমানের প্রচুর আমিষ থাকায় শিং মাছের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে। শিং মাছ চাষের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি কম জায়গায় এবং অধিক ঘনত্বে চাষ করা সম্ভব। ফলে ফলস্বরূপ, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক এ মাছ চাষে চাষিদের আগ্রহ ক্রমবর্ধমান।
চাষিদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, ৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে দেশি শিং মাছ চাষ করে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত মৎস্য চাষিরা আধা নিবিড় চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করে শিং মাছ চাষ করেন। এই পদ্ধতিতে তারা তুলনামূলক বেশি মুনাফা লাভ করেন।
দেশের শিং মাছের পোনা উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধলা এলাকা। সেখানে থেকে মাছের পোনা সংগ্রহ করে চাষিরা নির্ধারিত পুকুর বা জলাশয়ে চাষ শুরু করেছেন। তাছাড়া কুমিল্লা, যশোর, নরসিংদী, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলেও বর্তমানে শিং মাছের চাষ হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধলা গ্রামের মাছ চাষিরা দেশি শিং মাছ চাষ করে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। এক শতাংশের একটি ক্ষুদ্র পুকুরে শিং মাছ চাষ করে প্রতি ৬ মাস অন্তর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করার নজির স্থাপন করেছেন।
মাছ চাষকে কেন্দ্র করে ধলায় গড়ে উঠেছে ৩৫টি মৎস্য হ্যাচারি এবং কমপক্ষে ৫০০ পরিবার মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মাছ চাষ করে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন ৬ জন মৎস্য চাষি।
আজিম উদ্দিন, ধলা গ্রামের একজন মাছ চাষি, মাছ চাষ করে পরিবারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন এবং রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে তার ৩০টি পুকুরে মাছ চাষ করা হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, এক শতক জায়গায় কার্প জাতীয় মাছ ৫০ থেকে ৬০টি চাষ করা যায়, তবে তুলনামূলকভাবে অল্প জায়গায় শিং মাছ চাষ করে অনেক বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত ধলার যুবক অজিৎ বর্মণ বলেছেন, লেখাপড়ার পাশাপাশির তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছের পোনা সরবরাহ করেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জলাশয় খালি পড়ে আছে। সেসব জলাশয়ে অন্তত ৬ মাস শিং মাছ চাষ করে অনেক বেকার যুবক আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে।
দুইজন মাছ চাষি জানান, বর্তমান বাজারে ১ দশমিক ৫ বা ২ ইঞ্চির প্রতিটি শিং মাছের দাম ৩ টাকা। সে অনুযায়ী, ৫০ হাজার শিং মাছের পোনার দাম ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সঠিকভাবে খাবার এবং যত্ন নেওয়া হলে ৫ থেকে ৬ মাস পরে প্রতিটি শিং মাছের ওজন ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম হয়ে যায়, অর্থাৎ ৬ মাস পর ২০ থেকে ২৫টি শিং মাছের ওজন এক কেজি হতে পারে।
ধলার মাছ চাষিদের তথ্যানুসারে, যদি কোনো জলাশয়ে ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করা হয়, তাহলে কমপক্ষে ৪৮ হাজার শিং মাছ টিকে থাকে। ৬ মাস পর ৪৮ হাজার শিং মাছের মোট ওজন দাঁড়ায় ১ হাজার ৯২০ কেজি। বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি শিং মাছের পাইকারি বিক্রয় মূল্য ৫০০ টাকা। তাই ১ হাজার ৯২০ কেজি মাছের বিক্রয় মূল্য হয় ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
এদিকে, ৪৮ হাজার মাছের জন্য ৬ মাসে সর্বাধিক ৪ টন খাবার প্রয়োজন হয়। যদি প্রতি টন মাছের খাবারের খুচরা মূল্য ৫০ হাজার টাকা হয়, তাহলে ৪ টন খাবারের মোট দাম দাঁড়ায় ২ লাখ টাকা। কোনো জলাশয়ে ৬ মাস ধরে ৪৮ হাজার শিং মাছ চাষ করতে গেলে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ হয়ে থাকতে পারে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিলে, ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করে প্রতি ৬ মাসে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
সাধারণ হিসেব অনুযায়ী, এক শতাংশ জায়গায় ১ হাজার শিং মাছ চাষ করা সম্ভব। ৫০ হাজার শিং মাছ চাষ করার জন্য একটি ৫০ শতাংশের পুকুর বা জলাশয় প্রয়োজন হবে, যা থেকে বছরে অনুমান ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
কই, শিং এবং ঢেলাসহ দেশীয় ও হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ছোট মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)-এর সাবেক পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এইচ এম কোহিনুর।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মৎস্য বিজ্ঞানী শিং মাছ চাষের সম্ভাবনা ও পদ্ধতি সম্পর্কে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, শিং মাছ অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাছ। এ মাছে ফ্যাট বা তেলের পরিমাণ কম এবং সহজপাচ্য উচ্চমানের প্রচুর আমিষ থাকায় সবার মধ্যে বরাবরই বিশেষ করে রোগীদের মধ্যে এ মাছের ব্যাপক চাহিদা ও কদর রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জিয়ল মাছের চাহিদা অন্য মাছের চেয়ে আরও কিছুটা বেশি। সাধারণত মৎস্য চাষিরা আধা নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে থাকে। এই পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষে অধিক লাভ হয়ে থাকে। ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে অনেক চাষি বিএফআরআই-এর কারিগরি সহযোগিতায় শিং মাছের নিবিড় চাষে আকর্ষণীয় লাভ পেয়েছেন।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
ড. এ এইচ এম কোহিনুর বলেন, শিং মাছের নিবিড় চাষের জন্য ২০ থেকে ৬০ শতাংশ আয়তনের ছায়াযুক্ত পুকুর নির্বাচন করা যেতে পারে, যেখানে বছরে কমপক্ষে ৭-৮ মাস ১ থেকে ১.৫ মিটার পানি থাকতে হবে। শিং মাছ নিবিড় চাষের জন্য প্রথমেই পুকুরটি ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। পুকুরের তলদেশের পচা কাদা অপসারণ করে ৭ দিন রৌদ্রে শুকাতে হবে। এর পর তলা থেকে ক্ষতিকারক জীবাণু ধ্বংস করতে হবে এবং প্রতি শতাংশে ১৫ থেকে ২০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার ভালোভাবে ছিটিয়ে ৩ থেকে ৫ দিন পর পুকুরকে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ১ মিটার পরিমাণ পূর্ণ করতে হবে।
পানি পূর্ণ হওয়ার পর শতাংশ প্রতি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ কেজি কলিচুন পানিতে মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করে পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে। চুন প্রয়োগের ৩ দিন পরে পোনা মজুদের ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিং মাছের পোনা পরিবহনকালে মৃত্যুর ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে, সেক্ষেত্রে পোনা পরিবহনের সময় প্লাস্টিক ড্রাম ব্যবহার করাই উত্তম।
তিনি বলেন, দূরত্ব অনুযায়ী প্রতি ড্রামে ৭ থেকে ৯ সেন্টিমিটার আকারের ২ থেকে ৩ কেজি পোনা অথবা ১ হাজার থেকে দেড় হাজার পোনা পরিবহন করা সম্ভব। এভাবে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার সময় দূরত্বে নির্বিঘ্নে পোনা পরিবহন করা যেতে পারে।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
শিং মাছের নিবিড় চাষ ব্যবস্থাপনায় প্রতি শতাংশে ৬ হাজার সুস্থ্য-সবল এবং গুণগত মানসম্পন্ন পোনা প্রস্তুতকৃত পুকুরে মজুদ করা যেতে পারে। পোনা পুকুরে মজুদের সময় অবশ্যই পোনা ভর্তি পাত্রের পানির তাপমাত্রা ও পুকুরের পানির তাপমাত্রা সমান রাখতে হবে এবং ভালোভাবে অভ্যস্থকরণ বা কন্ডিশনিং করতে হবে। পোনা মজুদের পরের দিন থেকে প্রাণিজ প্রোটিন (৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ) সমৃদ্ধ সম্পূরক খাদ্য মাছের দেহ ওজনের শতকরা ১৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রয়োগ করা উচিত। সম্পূরক খাদ্যটি দুই ভাগে বিভক্ত করে সন্ধ্যার আগে ও সূর্য উদিত হওয়ার আগে প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক বলেন, শিং মাছের জন্য নিয়মিতভাবে পুকুরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং পানির গভীরতা ৪ থেকে ৫ ফুটের মধ্যে রাখতে হবে। প্রতি ১৫ দিন পরপর শিং মাছের নমুনায়ন করে সম্পূরক খাদ্যের পরিমাণ নির্ধারণ এবং পোনা মজুদের এক মাস পর হতে প্রতি ১৫ দিন অন্তর শতাংশ প্রতি ১০০ গ্রাম চুন ও পরবর্তী ১৫ দিন পর ৪০০ গ্রাম লবণ প্রয়োগ করতে হবে। সপ্তাহে কমপক্ষে ৩ দিন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা আবশ্যক।
তিনি আরও বলেন, সাধারণত পোনা মজুদের সাত মাস পর মাছ আহরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সময়ে মাছের গড় ওজন ৫৫ থেকে ৬৫ গ্রাম হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে ৫০ শতাংশ পুকুর থেকে ৭ মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার কেজি শিং উৎপাদন করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে ৭ থেকে ৮ মাসের মধ্যে শিং মাছের নিবিড় চাষে ৫০ শতাংশ পুকুরে চার লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় করে এক ফসলে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: নারী ও শিশুদের কল্যাণে ইউনিসেফের সঙ্গে অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন