০৫:০৮ পি.এম
বাবুগঞ্জ উপজেলার সংগ্রামী যুবক আবু বকর সিদ্দিকী সুমন, যিনি একজন সফল উদ্যোক্তার তকমা নিয়ে পরিচিত, তার সংগ্রামের গল্প এক অনুপ্রেরণা। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সংগ্রাম করতে করতে, আজ তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি জীবনে কখনো রেলওয়ের চাকরি, কখনো রংমিস্ত্রি আবার কখনো দিনমজুরের কাজ করেছেন।
বর্তমান সময়ে, তিনি শুধু নিজেই স্বাবলম্বী হননি, বরং হাজারো যুবককে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা যুবক, শিক্ষার্থী, বেকার ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে ইতিমধ্যে তিনি দুই হাজারেরও বেশি কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
অভাবের কারণে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে পড়াশোনা বন্ধ করে রেলওয়ে চাকরি গ্রহণ করেন বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের আবু বকর সিদ্দিকী সুমন। চাকরির পর তিনি ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে, বিশেষত লেবাননের বৈরুতে যান। তবে যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে তিনি সিরিয়া ও ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশ ঘুরে ১৭ মাস পর দেশে ফিরতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ঢাকার ফকিরাপুলে কখন রংমিস্ত্রি এবং কখন দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
২০২১ সালে মাছ চাষের জন্য ঋণগত কারণে তৎকালীন বাবুগঞ্জের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুজ্জামানের নির্দেশনায়, মাছের পাশাপাশি তিনি পেঁপে চাষ শুরু করেন। মৎস্য অধিদপ্তরের ৫০ হাজার টাকা সহায়তায় তিনি চাষে হাত দেন। শুরুতে ব্যর্থ হলেও পরে গাজীপুর থেকে উন্নতমানের পেঁপের বীজ এনে নিজেই চারা উৎপাদন শুরু করেন।
২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রযুক্তি শেখার পর নিজের পতিত জমিতে আধুনিক পেঁপে বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে ১ একর ৪৮ শতক জমি এবং তিনটি মাছের ঘেরের পাড়জুড়ে প্রায় ১ হাজার ২৫০টি পূর্ণবয়স্ক পেপেঁ গাছ দাঁড়িয়ে আছে। বাগানে শাহী, কাশ্মীরি ও টপ লেডি জাতের পেঁপে চাষ করা হয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে চার থেকে পাঁচ মণ পর্যন্ত ফল উৎপন্ন হয়। তার বাগানে সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি ওজনের একটি পেঁপেও উৎপাদিত হয়েছে।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সুমন কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার পেঁপে এবং ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার পেঁপের চারা বিক্রি করেছেন। এতে তার লাভ হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। গত মৌসুমে সুমন প্রায় ১৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। চলতি মৌসুমে কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রির প্রত্যাশা করছেন। এছাড়াও চলতি বছরের শুরুতে পেঁপের চারা বিক্রি করে প্রায় ৭ লাখ টাকা লাভ করেছেন।
চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তার এসেছে ধারাবাহিক সাফল্য। ২০২৩ সালে ছয় হাজার চারা বিক্রির মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হয়, তবে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজারে। ২০২৫ সালে চারা বিক্রির সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখে পৌঁছায়। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাঝেও ২০২৬ সালে ছয় লাখ চারা উৎপাদন ও বিক্রি করেছেন তিনি।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
আগামী বছরে সারাদেশে ২০ লাখ চারা বিক্রির লক্ষ্য স্থির করে তিনি ইতিমধ্যেই একটি আধুনিক পলি হাউজ নির্মাণ করেছেন। প্রতিটি চারায় খরচ বাদ দিয়ে প্রায় পাঁচ টাকা লাভ হয় বলে জানান তিনি। শুধু পেঁপে নয়, মাছের ঘেরের পাড়ে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, চিচিঙা, ধুন্দুল, করলা ও বরবটি সহ বিভিন্ন সাথী ফসলও চাষ করছেন। পুকুরপাড়ে মাচা পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করেও বছরে অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন।
সাফল্যের কথা তুলে ধরে সুমন বাসস’কে বলেন, “আমাদের দেশে কৃষিই হতে পারে বেকারত্ব দূর করার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। মাত্র কয়েকটি গাছই বদলে দিতে পারে একজন বেকার চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীর জীবন।”
তিনি জানান, “আমি চাই বেকার যুবক ও শিক্ষার্থীরা কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করুক। একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনার পাশাপাশি মাত্র ২৫টি উন্নত জাতের পেঁপে গাছ লাগিয়ে সঠিক পরিচর্যা করেন, তাহলে একটি মৌসুমেই প্রায় এক লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। অন্যের চাকরির অপেক্ষায় না থেকে বাড়ির পতিত জমিকে কাজে লাগাতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আমার ট্রেনিং সেন্টারে বিনা মূল্যে পেঁপে চাষের প্রশিক্ষণ দিই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এসে প্রশিক্ষণ নিয়ে সফল উদ্যোক্তা হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
অল্প জমিতে বেশি ফলন উৎপাদনের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশ থেকে সাতটি সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। নেপাল থেকে কৃষি সম্মাননা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, ভারতের মহাত্মা গান্ধী ও মাদার তেরেসা সম্মাননাসহ একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে।
বায়লাখালী গ্রামের তরুণ সফিকুল ইসলামের সঙ্গে আলাপকালে জানান, “সুমন ভাই নিজে সফল হওয়ার পর এখন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসছেন। অনেকে তার কাছ থেকে চারা নিয়ে সফলভাবে পেঁপে চাষ করছেন।”
বাবুগঞ্জের আসলাম উদ্দিন বলেন, “আমি তার কাছ থেকে উন্নত জাতের চারা নিয়ে চাষ করে সফল হয়েছি। এটা আমার নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি করেছে।”
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বাসস’কে বলেন, “আমরা একাধিকবার তার বাগান পরিদর্শন করেছি। তিনি একজন পরিশ্রমী ও উদ্যমী কৃষি উদ্যোক্তা। উন্নতমানের পেঁপের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি কৃষকদের সহায়তা করছেন। তার এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়। তাকে অনুসরণ করে অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষে এগিয়ে এলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন