০৭:৩০ পি.এম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটনকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ক্রমাগতভাবে উঠেছে। এক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র থেকে প্রকাশ পায় যে, সেলিম রেজা নিউটন দীর্ঘ সময় ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর, লেখক ও জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নাগরিক অধিকার ভিত্তিক ইস্যুর ওপর সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। তিনি বরাবরই অন্যায়, বৈষম্য এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে থাকতে দেখা গেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে তিনি বহুবার সরব হয়েছেন।
২০২৪ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের সময়, তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার এবং হামলার অভিযোগ ওঠছিল, সেই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
তার এই ভূমিকার কারণেই তিনি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন, তবে পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা, অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত আক্রমণেরও শিকার হয়েছেন। আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের পর থেকেই তাকে এবং তার পরিবারকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অনলাইন হয়রানি, হত্যার হুমকি ও কুৎসার প্রচার শুরু হয়ে গেছে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
জানতে চাইলে সেলিম রেজা নিউটন বলেন, “আমার ইনবক্স ভরে গেছে হত্যার হুমকি, গালাগালি আর অশ্লীল বার্তায়। শুধু আমাকে নয়, আমার স্ত্রী, কন্যা, বোনসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়েও নোংরা ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। এমনকি কোথায় থাকি, কোন পথে চলাফেরা করি - এসব খোঁজ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রকাশ্যে পোস্ট করা হচ্ছে। এই অনলাইন আক্রমণ কখনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘ সময় ধরে সমন্বিতভাবে পরিচালিত একটি প্রচারণার অংশ, যার লক্ষ্য হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করা।
তিনি আরও জানান, “আমার পরিবারের সদস্যরাও এই প্রচারণা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। আমার কন্যা, স্ত্রী, বোন - সবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে গিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করা হচ্ছে। তাদের ছবি বিকৃত করা হচ্ছে। ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা ধরনের সহিংস হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এগুলো শুধু অনলাইন ট্রল নয়; এগুলো মানসিক সন্ত্রাস। আমার পরিবারের জন্য এটা একেবারে ভয়াবহ মানসিক চাপের বিষয়। আমি একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা করছি, এ ধরনের প্রকাশ্য সহিংস উসকানি ও হুমকির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নিউটনের অভিযোগ, তার পরিবারের ব্যক্তিগত তথ্য ফেসবুকে প্রকাশ করা হবে বলে পোস্ট করা হয়েছে। তিনি জানান, কোথায় থাকি, কার সঙ্গে চলাফেরা করি - এসব তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এগুলো আন্তর্জাতিকভাবে ‘ডক্সিং’ নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হল একজন মানুষকে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া। এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল অনলাইন হয়রানি নয়, বরং বাস্তব জীবনে হামলা বা সহিংসতার ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো এসব হুমকি এবং সাইবার বুলিং করার পেছনে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুসারীরা জড়িত। যদিও ফেসবুকে তাদের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না, বেশিরভাগের ফেসবুক প্রোফাইলে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা ছাত্রলীগের লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। এটা বোঝায় যে তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত।
নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাবিব জাকারিয়া বলেন, এগুলো খুবই সুপরিকল্পিত। আমি মনে করি যারা জুলাইয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন তারা এই হ্যারেজমেন্টটা করছে। তারা নানাভাবে হ্যারেজ করার চেষ্টা করছে। নিউটনকে এভাবে হ্যারেজ করাটা বোকার কাজ, খুবই নির্বোধের কাজ। নিউটন আজকালকের লড়াকু লোক নয়, সে সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে এসেছে। এটা কখনোই কাম্য নয়। রাষ্ট্রকে এই জায়গায় পৌঁছাতে হবে। আশা করি সরকার বিষয়গুলো বুঝতে পারবেন এবং নিউটনের নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, যেকোন ধরনের নোংরামি সমর্থন করার কোনো সুযোগ নেই। আমি যেকোনো মানুষের ওপরেই যদি কোনো সাইবার বুলিং হয়, যেকোনো মানুষকে যদি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়, সেটা কখনোই কাম্য নয়। আমরা ওইরকম একটা সমাজ কখনোই চাই না। সেলিম রেজা নিউটন একজন ব্যক্তি নয়, আমি মনে করি সে একটা প্রতিষ্ঠান। আমি এই বিষয়গুলোর নিন্দা জানাই। তার বিরুদ্ধে যারা এগুলো করছে সেগুলো ক্ষতিয়ে দেখা উচিত এবং শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি এই বিষয়টি ফেসবুকে দেখেছি। তবে তিনি কোনো অভিযোগ বা এধরণের কিছু আমাদেরকে জানাননি। এছাড়া সাইবার বুলিং একটি বৃহৎ বিষয়, এখানে আসলে সুনির্দিষ্ট দোষীকে চিহ্নিত করা কঠিন। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর অভিযোগটা জরুরি। তিনি যদি অভিযোগ করেন তাহলে আমরা বিষয়টি দেখতে পারি। দেশের বাইরে বা অন্য কেউ হলে সেক্ষেত্রে আমাদের তো সেই মেকানিজম নেই। তাকে কে কোথা থেকে কি বলছে তা বের করা আমাদের জন্য কষ্টকর। তবে তিনি সাহায্য চাইলে আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করবো।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন