০৩:৫২ এম
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ফুলশ্রী গ্রাম এখন অনেকটাই জনশূন্য অবস্থায় পরিণত হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামি ওই গ্রামের রিয়াজ ফকিরের (২৬) পুলিশের নির্যাতনে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর তার স্বজন এবং এলাকাবাসী মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধর করে আহত করেন। এ ঘটনার পর দায়ের হওয়া মামলার কারণে গ্রেপ্তার আতঙ্কে গ্রামের অধিকাংশ নারী ও পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে। ফলে গ্রামের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরা সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়াতে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে, থানা পুলিশের দায়ের করা মামলায় ৪৩ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও তিন শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২২ জন নারী ও পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে নামোল্লেখ করা আসামিদের নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসী মিছিল নিয়ে থানায় ঢুকে হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও এজাহারে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে পুরো উপজেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামলার ঘটনার সাথে থানার সংলগ্ন বাকাল ইউনিয়নের ফুলশ্রী গ্রামের নারী ও পুরুষরা জড়িত থাকলেও মামলার এজাহারে রাজিহার ও গৈলা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং যুগান্তর প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলা টিভির বরিশাল প্রতিনিধি এফএম নাজমুল রিপনকেও মামলার আসামি করা হয়েছে।
একইসাথে দীর্ঘদিন যাবৎ নিজ এলাকা গৈলা ইউনিয়নের সেরাল গ্রাম থেকে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী যুবলীগের আগৈলঝাড়া উপজেলা শাখার সভাপতি কামরুজ্জামান আজাদ সেরনিয়াবাত এবং জেলা যুবলীগ নেতা সাগর সেরনিয়াবাতকেও আসামি করা হয়েছে। এই দুই সাংবাদিক নেতাকে আলোচিত মামলায় আসামি করার বিষয়ে সম্পূর্ণ রহস্যজনক দাবি করে শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ স্থানীয় সংসদ সদস্য ও তথ্যমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন স্বপনকে পুরো বিষয়টি অবহিত করেন। প্রেসক্লাবের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে তথ্যমন্ত্রীর মতবিনিময় সভায় বিষয়টি জানানো হয়। পরবর্তীতে থানার ওসির উপস্থিতিতে তথ্যমন্ত্রী সঠিক তদন্ত করার জন্য এবং পুরো ঘটনার ভিডিওচিত্র পর্যালোচনা করে নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলায় যেন হয়রানী করা না হয়, সেজন্য ওসিকে নির্দেশ প্রদান করেন। পাশাপাশি তথ্যমন্ত্রী পুরো ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারপূর্বক আইন অনুযায়ী আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতা করার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
অপরদিকে, বরিশালের পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, থানায় হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য সাঁড়াশি অভিযান চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিওচিত্র এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পুলিশ সুপার আরও বলেছেন, যদি কারো নাম ভুলবশত এজাহারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে এবং তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তবে তাদের কোনো ধরনের হয়রানী বা গ্রেপ্তার করা হবে না। আপাতত ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সূত্রমতে, আলোচিত মামলায় গ্রেপ্তারের পর জেলহাজতে প্রেরিত ব্যক্তিরা হলেন রিয়াজ ফকিরের বাবা সিদ্দিক ফকির, বোন শারমিন আক্তার, গিয়াস ফকির, সবুজ ফকির, মান্নান ফকির, রিফাত ফকির, নাঈম ফকির, হাবিবুর রহমান, রাজুহাওলাদার, তাহমিনা বেগম, মনোয়ারা বেগম, আসমা আক্তার, মমতাজ বেগম, ঝুমুর বেগম, নাজমা আক্তার, তানজিলা আক্তারসহ মোট ২২ জন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ১২ জন নারী এবং ১০ জন পুরুষ। নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফুলশ্রী গ্রামের একাধিক ব্যক্তি বলেন, গ্রেপ্তারকৃত নাঈম ফকির ঘটনার দিন বাড়িতে ছিলেন না।
মিছিল কিংবা থানার কোন ঘটনায় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তবুও তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। যার কারণে পুরো গ্রামে তরুণ ও যুব সমাজসহ সব বয়সের নারী-পুরুষের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে পুরো ফুলশ্রী গ্রাম এখন অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ টহল দিচ্ছে। যার ফলে পুলিশের চলমান অভিযানের কারণে গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের নারী ও পুরুষ সদস্যরা অনেকটাই আত্মগোপনে চলে গেছেন। থানার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যায় নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে চুরি মামলার সন্দেহভাজন আসামি ফুলশ্রী গ্রামের রিয়াজ ফকিরকে একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। থানায় থাকার সময় রিয়াজ লোহার দরজায় নিজেই মাথায় আঘাত করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে ওই রাতে তাকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় এবং গভীর রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিকেলে কয়েকশ’ মানুষ মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা চালায়। এ সময় থানার বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুরসহ কর্তব্যরত ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমকে মারধর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং পুলিশের ছয় সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হন। এ ঘটনায় আগৈলঝাড়া থানার এসআই ওমর ফারুক বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় বেআইনি সমাবেশ ও দাঙ্গা, অনধিকার প্রবেশ, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, সরকারি কাজে বাঁধা প্রদান, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, গুরুতর আঘাত এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন