০২:১০ পি.এম
বয়সের সাথে সাথে চুলের পেকে যাওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রথম সাদা চুল দেখা দিলে অনেকেই এটিকে বয়সের চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্যরা চুলের রঙ ঢাকতে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তবে সম্প্রতি একটি গবেষণায় চুল পাকার সাথে শরীরের কোষীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অপ্রত্যাশিত সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে দেখেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কিছু কোষ ক্যানসারে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি এড়াতে নিজেদের পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। এই পরিবর্তনের ফলে চুলের রঙ তৈরির কোষের মজুত কমে গিয়ে চুল সাদা বা ধূসর হয়ে যেতে পারে। গবেষণার ফলাফল দ্য টেলিগ্রাফ ও সায়েন্স ডেইলির প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি নেচার সেল বায়োলজি সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়েছে।
চুলের রং তৈরি হয় যেভাবে
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
মেলানোসাইট স্টেম সেল চুলের রঙ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চুলের গোড়ার গভীরে অবস্থিত এই কোষ প্রয়োজন অনুযায়ী রঞ্জক কোষ তৈরি করে। এই রঞ্জক কোষগুলি চুল ও ত্বকের রঙ নির্ধারণ করে।
চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ঝরে পড়ার চক্রের সাথে তাল মিলিয়ে এই কোষগুলো নিয়মিতভাবে সক্রিয় হয়। নতুন কোষ তৈরি করে আবার বিশ্রামে চলে যায়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চুলের স্বাভাবিক রঙ বজায় থাকে।
ক্ষতিগ্রস্ত কোষের অদ্ভুত সিদ্ধান্ত
শরীরের অন্যান্য কোষের মতো চুলের রঙ তৈরির এই কোষগুলোও বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিবেগুনি রশ্মি, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ এবং শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় তৈরি ক্ষতির কারণে তাদের বংশগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরও পড়ুন: ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৫ শিশুর মৃত্যু
গবেষণায় দেখা গেছে, মেলানোসাইট স্টেম সেলের বংশগত উপাদানে গুরুতর ক্ষতি হলে কোষটি একটি বিশেষ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে সেনো-ডিফারেনশিয়েশন নাম দিয়েছেন। সহজ ভাষায়, ক্ষতিগ্রস্ত স্টেম সেল দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রঞ্জক কোষে পরিণত হয়ে যায় এবং এরপর সেটি আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
ফলে নতুন রঞ্জক কোষ তৈরির মজুত ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। এর ফলস্বরূপ চুলে ধূসর বা সাদা রঙ দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ একটি সাদা চুলকে এমন একটি কোষীয় পরিবর্তনের চিহ্ন হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ কোষটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আগেই নিজের স্টেম সেল অবস্থান ছেড়ে দেয়।
চুল পাকা মানেই ক্যানসার থেকে সুরক্ষা নয়।
তবে গবেষকেরা এমন দাবি করেননি যে চুল পেকে গেলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমে যায় বা ক্যানসার থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। বরং তাদের ধারণা, চুল পাকার এই প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হয়ে ওঠার সুযোগ কমানোর একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হতে পারে।
আরও পড়ুন: ক্যানসার হাসপাতালগুলোতে রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
তবে এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সব সময় একইভাবে কাজ করে না। ক্ষতির ধরন এবং কোষের আশপাশের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে এর পরিণতি ভিন্ন হতে পারে।
একই কোষ, দুই রকম পরিণতি
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, সব ধরনের ক্ষতির ক্ষেত্রে কোষ একই পথ বেছে নেয়নি। কিছু পরিস্থিতিতে আশপাশের টিস্যু থেকে পাওয়া সংকেত ক্ষতিগ্রস্ত স্টেম সেলকে আবার বিভাজিত হয়ে সংখ্যা বাড়াতে উৎসাহিত করেছে।
এর ফলে বংশগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত থাকা সত্ত্বেও কোষগুলো টিকে থেকে বিভাজিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতি ত্বকের মেলানোমা নামের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যখাতের বাজেটের বড় অংশ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয় হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
বিজ্ঞানীরা এই দুই বিপরীত পরিণতিকে পরস্পরবিরোধী পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ একই ধরনের স্টেম সেল ক্ষতির ধরন ও আশপাশের পরিবেশের সংকেত অনুযায়ী কখনো চুল পাকার কারণ হতে পারে, আবার কখনো ক্যানসারের সূচনাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বয়স বাড়লে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের কোষে বংশগত উপাদানের ক্ষতি জমতে থাকে। একই সাথে ক্ষতি শনাক্ত করা, মেরামত করা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ সরিয়ে ফেলার স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
নতুন গবেষণা বলছে, চুল পাকা ও ত্বকের মেলানোমার মতো বিষয়গুলোর পেছনে কিছু অভিন্ন কোষীয় প্রক্রিয়া থাকতে পারে। শরীর কোনো ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে সরিয়ে দেবে, নাকি তাকে টিকে থেকে বিভাজিত হওয়ার সুযোগ দেবে—এই সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করতে পারে।
আরও পড়ুন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিনামূল্যে অনলাইন কোর্সে আবেদন করার পদ্ধতি
মানুষের ক্ষেত্রে এখনও নিশ্চিত নয়
তবে গবেষণার ফল থেকে এখনই মানুষের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হয়েছে। ইঁদুর ও মানুষের জীববিজ্ঞানে পার্থক্য রয়েছে। মানুষের বংশগত বৈশিষ্ট্য, জীবনযাপন ও পরিবেশও এই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
অতএব, মানুষের চুল পাকার সাথে মেলানোমার ঝুঁকির সম্পর্ক কেমন, তা নিশ্চিতভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। নতুন এই গবেষণা চুল পাকার মতো স্বাভাবিক একটি ঘটনাকে শরীরের কোষীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সাথে বোঝার ক্ষেত্রে নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে।
আরও পড়ুন: খাদ্যপণ্যে নিষিদ্ধ টেক্সটাইল রং ও হাইড্রোজ মেশানোর ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন