০৪:০৮ পি.এম
সাম্প্রতিক বন্যায় মৌলভীবাজারের পাঁচটি উপজেলার ৯০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকশো হেক্টর ফসলি জমি ও ৪ হাজার বসতঘর। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শতকোটি টাকা। মনু ও ধলাই নদীর বাঁধের ৫টি স্থানে উন্মুক্ত থাকায় নদী পাড়ের মানুষ আবারও বন্যা আতঙ্কে রয়েছেন।
বাঁধ পুনর্নির্মাণ, কৃষিখাতের ক্ষতি ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগের আশ্বাস জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল।
সাম্প্রতিক টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের খরস্রোতা মনু ও ধলাই নদীর ৫টি স্থানে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। এই ভাঙনের ফলে জেলার রাজনগর, কুলাউড়া, কমলগঞ্জসহ ৫ উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে যায়। এতে আউশ ফসল, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং গ্রামীণ অভ্যন্তরীণ কাঁচাপাকা সড়ক যোগাযোগ ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা রাজনগর, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর। এবারের অল্পকালীন বন্যায় ৫টি উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রয়েছে। এতে ৪ হাজার মানুষ তাদের বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। জমিতে লাগানো আউশ, আমনের বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন ৪০০ হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। টাকার হিসাবে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি টাকা। এছাড়া রাজনগর, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ৯০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কপথ ও ৫টি কালভার্ট ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সড়কপথের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি রাজনগর, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার। টাকার হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সেই সাথে রাজনগর উপজেলায় ২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে।
মৎস্যখাতে ৪০৫টি পুকুরের মাছ ও পোনামাছ ভেসে গেছে। এ মৎস্যখাতে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার ক্ষতি ধরা হয়েছে। এছাড়াও মনু ও ধলাই নদীর ৫টি স্থানে ভাঙন ও নদী দুটির বাঁধে একাধিক স্থান ফাটল দেখা দেয়। এতে টাকার হিসেবে আরও ১ কোটি টাকার ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়। সব মিলে এবারের প্রথম দফা বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শতকোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত লোকেরা সরকারের কাছে পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছেন।
সরেজমিনে রাজনগর ও কমলগঞ্জসহ আরও কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সঙ্গে সময় সংবাদ কথা বলে। রাজনগর উপজেলার মনুনদীর ভাঙন এলাকার উজিরপুরের বৃদ্ধ আব্দুল হান্নান জানান, এ বন্যায় নদী পাড়ের তার ঘরের ক্ষতির পাশাপাশি গৃহপালিত বেশ কয়েকটি হাঁস-মুরগি হারিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমি এমনিতেই একজন অসহায় বৃদ্ধ লোক। পরিবারের আয়-রোজগারের কোনো পথ নেই।' একইভাবে একামধু গ্রামের জয়নাল মাস্টার জানালেন, তার ঘর থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে মনু বাঁধ। কিন্তু পানির চাপে তার ঘরের পাশে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। এতে তার ঘর-গেরস্থির ব্যাপক ক্ষতি হয়。
তিনি বলেছেন, 'এখন নতুন আতঙ্ক নদীর ভাঙা বাঁধ। নদীতে পানি বাড়লে আবারও বন্যা হবে।' কথা হয় কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ধলাই নদীর ভাঙনের শিকার মকাবিলের রমজান আলী, সালাউদ্দিনসহ অনেকের সঙ্গে। সবার অভিব্যক্তি এক, মকাবিল মসজিদের পাশের ভাঙনে কৃষি নির্ভরশীল আদমপুর ইউনিয়নের গাঁগুলো তছনছ হয়ে গেছে। মুসলিম মনিপুরী পাঙ্গন সম্প্রদায়ের লোকেরা আগে থেকেই পিছিয়ে পড়া এক জাতি। এখন বন্যা তাদের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
স্থানীয় লোকজন জানালেন, মকাবিলের মনু ভাঙন এলাকার প্রতিরক্ষা বাঁধ মেরামত করতে চাইলে প্রতিবারই ভারতের সীমান্ত রক্ষী বিএসএফ বাধা দিচ্ছে। এতে বিশাল আকৃতির মনুর ভাঙন মেরামত করা যাচ্ছে না। বাঁশের ওপর কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকা মকাবিল গ্রামের রমজান আলী তার ঘরটি দেখিয়ে জানান, তিনি একদম অসহায়। যে কোনো সময় তার ঘরটি পড়ে যাবে। ঘর মেরামতের তার কোনো সামর্থ্য নেই।
এদিকে আদমপুর বাজার থেকে ভান্ডারিগাঁও পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় একেবারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক কালভার্ট ও সেতু ভেঙে গেছে। এ অঞ্চলের কাঁচা সড়কের আরও বেহাল দশা। একইভাবে রাজনগর, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সড়কপথেরও অবস্থা মোটেই ভালো নয়।
কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় জানিয়েছেন, তার এলাকাটি মূলত কৃষি প্রধান এলাকা। এ অঞ্চলের অন্যতম ফসল গ্রীষ্মকালীন টমেটো। তিনি বলেন, 'টমেটোসহ আউশ এবং আমনের বীজতলা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।' তার হিসেব অনুযায়ী, এ উপজেলায় ২ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। আর প্রায় ২০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এলজিইডির প্রকৌশলী মো. সাইফুল আজম জানিয়েছেন, কমলগঞ্জে ৫০ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতির পরিমাণ টাকার হিসেবে প্রায় ১০ লাখ টাকা। একইভাবে রাজনগর উপজেলার প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তা রাজু চন্দ্র পাল জানান, তার উপজেলায় সড়ক পথমূল্যে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কুলাউড়া উপজেলায় সড়কপথের প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
জেলার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করে সময় সংবাদকে জানিয়েছেন, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। যখন এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে, তখন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন