০৪:২৬ পি.এম
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (এইচএসআইএ) তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে বিশ্বব্যাপী পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। এটি বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে ওঠার লক্ষ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক আস্থার প্রতিফলন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বের প্রসিদ্ধ বিমানবন্দর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতে প্রবেশ করতে আগ্রহী হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রীগ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য দ্বিতীয় অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই এই আগ্রহ ফুটে উঠেছে।
আলোচনায় যুক্ত বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, যাত্রীসেবা সম্পর্কিত গ্রাউন্ড সার্ভিসের জন্য দ্বিতীয় একজন অপারেটর নিয়োগ করা হবে। তবে নতুন টার্মিনালের কার্গো হ্যান্ডলিং বা পণ্য ওঠানো-নামানোর দায়িত্ব একমাত্র বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হাতে থাকবে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘দ্বিতীয় হ্যান্ডলারের কাজ শুধু যাত্রী ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব এককভাবে বিমানের কাছেই থাকবে।’
খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এ অগ্রগতিকে বাংলাদেশের সম্প্রসারণশীল এভিয়েশন শিল্পের জন্য একটি শক্তিশালী স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করছেন। ক্রমবর্ধমান যাত্রীর সংখ্যা, বড় ধরনের অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এই খাতের মূল চালিকাশক্তি।
আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) এমিরেটস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডনাটা এবং সিঙ্গাপুরের স্যাটস। এই সবগুলো প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বিমানবন্দর সেবাদানকারী সংস্থা।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ মাফিদুর রহমান জানিয়েছেন, একসঙ্গে এতগুলো আন্তর্জাতিক এভিয়েশন কোম্পানির আগ্রহ দেখানো একটি বিরল ঘটনা। এটি দক্ষিণ এশিয়ার এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বকেই প্রমাণ করে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
কূটনৈতিক তৎপরতায় আস্থার প্রতিফলন
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করতে এসেছিলেন। সেখানে তারা নিজ নিজ দেশের কোম্পানির আগ্রহ সম্পর্কে আলোচনা করেন।
মাফিদুর রহমান জানান, ‘এই কূটনৈতিক তৎপরতা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সম্প্রসারণশীল এভিয়েশন বাজারকে বিশ্বব্যাপী কতটা বাণিজ্যিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কতটা আস্থা রয়েছে।’
একটি যুগান্তকারী সংস্কার
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
তৃতীয় টার্মিনালের এই সিদ্ধান্তটি নির্দেশ করে যে, এটি একটি বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন। কারণ, গত কয়েক দশক ধরে যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের একক দায়িত্ব ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হাতে। এখন সেখানে প্রতিযোগিতা নির্মিত হচ্ছে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, যাত্রী চেক-ইন, র্যাম্প অপারেশন এবং উড়োজাহাজ অবতরণের পর পুনরায় ওড়ার জন্য উপযোগী করার প্রক্রিয়া। এগুলো বিমানবন্দরের পরিচালন দক্ষতা এবং যাত্রী সেবার মানের ওপর প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলে।
বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো এই খাতে আরও অধিক প্রতিযোগিতার দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিল। তাদের মতে, এর ফলে সেবার মান বৃদ্ধি পাবে, উড়োজাহাজ প্রস্তুত করতে সময় কমবে এবং বাংলাদেশের বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এয়ারলাইন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, বিষয়টি আরও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত, এমনকি এটি পরের ধাপে করা গেলেও চলতো। তবে আপাতত যাত্রী সেবা হ্যান্ডলিংয়ে অন্তত প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে দেখে আমি আনন্দিত।’
বিশিষ্ট এভিয়েশন উদ্যোক্তা এবং টাস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হকও এই বৈশ্বিক আগ্রহকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন।
তিনি জানান, ‘কার্গো ভিলেজ এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং— উভয় কার্যক্রমই আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ অপারেটরদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘মালিকানা হয়তো সরকারের কাছে থাকবে, তবে পরিচালনার দায়িত্ব অভিজ্ঞ ও দক্ষ বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর কাছে দেওয়া উচিত। পেশাদার অপারেটররা দক্ষতা, নিরাপত্তা, নিয়ম-কানুন মেনে চলা এবং সেবার মান উন্নয়নে সাহায্য করবে। পাশাপাশি তারা স্থানীয় জনশক্তিকেও এ বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে পারবে।’
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানালেও, তৃতীয় টার্মিনালের স্বয়ংক্রিয় কার্গো ভিলেজে বিমানকে একমাত্র কার্গো হ্যান্ডলার হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
মফিজুর রহমান জানান, ‘বিমানের কার্গো হ্যান্ডলিং আন্তর্জাতিক মানের কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এর সক্ষমতা এবং সততার উভয় বিষয়েই উদ্বেগ বিদ্যমান।’
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান মাফিদুর রহমানও মনে করেন, টার্মিনালের উন্নত কার্গো সিস্টেমের সর্বোচ্চ সুফল পেতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।
তিনি জানিয়েছেন, ‘যেসব যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে তা অত্যন্ত আধুনিক এবং এগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞ অপারেটর।’
আরও পড়ুন: নারী ও শিশুদের কল্যাণে ইউনিসেফের সঙ্গে অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ
তিনি আরো বলেন, ‘শুরুতেই বিমানের পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক অপারেটর যদি কাজ করতে পারতো, তাহলে ভালো হতো। এর ফলে স্থানীয়ভাবে পরিচালনার আগে আমাদের জনশক্তি কাজগুলো শিখে নিতে পারতো।’
তবে তিনি আশাবাদী হিসেবে বলেন, ‘হতাশ হতে কিছু নেই। যদি দক্ষ পেশাদারদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় তবে এভিয়েশন খাতকে নতুন গতি দেওয়া সম্ভব।’
বিমানের আত্মবিশ্বাস
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানিয়েছেন, বিমান ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করেছে এবং তৃতীয় টার্মিনালের জন্য এক হাজারেরও বেশি অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী ও কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, বিমান কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার বিষয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে কাজ করছে। তবে দ্বিতীয় যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি তারা পাননি।
চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, নিপ্পন কোয়েই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন সমন্বয়ে গঠিত একটি জাপানি কনসোর্টিয়াম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন