০৯:১২ পি.এম
হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। যদিও হাম প্রতিরোধে টিকা অত্যন্ত কার্যকর, তবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সময়ে এর সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। বাস্তবতা হলো, হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধুমাত্র টিকা আবিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়; প্রত্যেক শিশুকে সময়মতো টিকার আওতায় আনা, দুই ডোজ সম্পন্ন করা এবং জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশের মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে চলমান হাম প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার সংক্রমণ এবং প্রায় ৮৯০ শিশুর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হামের টিকার কার্যকারিতা অত্যন্ত বেশি। একটি ডোজ টিকা হাম প্রতিরোধে প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং দুই ডোজ প্রায় ৯৭ শতাংশ কার্যকর। অর্থাৎ, টিকা নেওয়ার পরও অল্পসংখ্যক মানুষের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
সমস্যার মূল জায়গা হলো—যারা টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে, অসম্পূর্ণ টিকা নিচ্ছে এবং যেসব জনগোষ্ঠীতে সামগ্রিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
১. টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই বড় ঝুঁকি
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
হাম এতটাই সংক্রামক যে এর বিস্তার ঠেকাতে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় সামগ্রিক টিকাদানের হার ৯০ শতাংশ হলেও তা হামের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। কারণ বাকি ১০ শতাংশ টিকাবঞ্চিত শিশু যদি একই মহল্লা, বস্তি, শরণার্থীশিবির বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে সেখানে সংক্রমণের ‘ঝুঁকিপূর্ণ পকেট’ তৈরি হতে পারে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের বড় অংশ টিকা নেয়নি অথবা টিকার পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করেনি। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি এবং সন্দেহভাজন মৃত্যুর বড় অংশ দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এমনকি টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই কিছু শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
২. এক ডোজ আর দুই ডোজ এক নয়
এক ডোজ টিকা অত্যন্ত কার্যকর হলেও শতভাগ শিশুকে সুরক্ষা দিতে পারে না। প্রথম ডোজের পর কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি নাও হতে পারে। দ্বিতীয় ডোজের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এসব শিশুকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়া। তাই ‘টিকা দেওয়া হয়েছে’ এবং ‘দুই ডোজ টিকা সম্পন্ন হয়েছে’—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। একটি ডোজে প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং দুই ডোজে প্রায় ৯৭ শতাংশ শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।
৩. টিকাদান কর্মসূচিতে সাময়িক ঘাটতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
আরও পড়ুন: ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৫ শিশুর মৃত্যু
টিকাদান কর্মসূচিতে কয়েক মাসের ঘাটতিও কয়েক বছর পর বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে। নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়া শিশুরা পরবর্তী সময়ে হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের জন্য একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ফলে টিকাদানের ঘাটতি শুধু বর্তমান প্রজন্মের সমস্যা নয়; এর প্রভাব ভবিষ্যতেও বহন করতে হয়। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত WHO সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪–২০২৫ সালে টিকাদানের ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত জাতীয় ক্যাম্পেইনের অনুপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
৪. হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল হলে হাম দ্রুত ছড়ায়
হাম অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারেন। বদ্ধ পরিবেশেও ভাইরাস কিছু সময় সংক্রমণক্ষম থাকতে পারে। এ কারণে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বস্তি, শরণার্থীশিবির, স্কুল, হাসপাতাল কিংবা একই পরিবারের মধ্যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তিই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে সংক্রমিত করতে পারেন। তাই হামের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ কভারেজ যথেষ্ট নয়; ৯৫ শতাংশের বেশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. টিকা নেওয়ার পরও কেউ কেউ আক্রান্ত হতে পারেন
আরও পড়ুন: ক্যানসার হাসপাতালগুলোতে রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
কোনো টিকাই শতভাগ কার্যকর নয়। দুই ডোজ হামের টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৯৭ শতাংশ হওয়ায় অল্পসংখ্যক টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিও সংক্রমিত হতে পারেন। বিশেষ করে ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের সময় টিকাপ্রাপ্ত শিশুরাও ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হতে পারে। তবে এটি টিকার ব্যর্থতা নয়। বরং টিকা ব্যাপকভাবে সংক্রমণ এবং গুরুতর রোগের ঝুঁকি কমায়।
৬. অপুষ্টি হামের ঝুঁকি বাড়ায়
হামের প্রভাব শুধু ভাইরাসের ওপর নির্ভর করে না; শিশুর সামগ্রিক পুষ্টিগত অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। অপুষ্ট শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। ফলে টিকা নেওয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে। অপুষ্টির কারণে হামের জটিলতার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি হামের জটিলতা আরও বাড়াতে পারে।
৭. সহসংক্রমণ রোগের তীব্রতা বাড়াতে পারে
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যখাতের বাজেটের বড় অংশ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয় হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
হামের সঙ্গে অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সহসংক্রমণ হলে রোগের তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। লেখায় অ্যাডিনোভাইরাসসহ অন্যান্য জীবাণুর সহসংক্রমণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা হামের রোগীদের জটিলতা ও প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
৮. ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’: হাম শুধু হামই নয়
হামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি হলো ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’ বা রোগপ্রতিরোধ স্মৃতির দুর্বলতা। হামের ভাইরাস শরীরের এমন কিছু মেমোরি কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যেগুলো পূর্বে পরিচিত জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ফলে হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও কিছু সময় শিশুর অন্যান্য সংক্রমণের প্রতি ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ হাম শুধু একটি শিশুকে সাময়িকভাবে অসুস্থ করে না; এর প্রভাব শিশুর পরবর্তী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু টিকার কার্যকারিতা নয়, টিকার ব্যাপকতা ও সমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে টিকা দেওয়া মানে শুধু তাকে সুরক্ষিত করা নয়; একই সঙ্গে তার পরিবার, সহপাঠী এবং পুরো সমাজকে সুরক্ষিত করা। বিপরীতে, কিছু শিশু যদি টিকার বাইরে থেকে যায় এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর জমতে থাকে, তাহলে জনগোষ্ঠীর মধ্যে আবার সংক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে হামের অভিজ্ঞতা এজন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে, প্রতিটি শিশুর জন্য দুই ডোজ নিশ্চিত করতে হবে এবং জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশের বেশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে হবে। হাম প্রতিরোধের লড়াইয়ে শুধু টিকা থাকা যথেষ্ট নয়—প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া এবং নির্ধারিত দুই ডোজ সম্পন্ন করাই হলো প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
আরও পড়ুন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিনামূল্যে অনলাইন কোর্সে আবেদন করার পদ্ধতি
কর্নেল (অব.) নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এমপিএইচ, ডিএমও, ডিএই (যুক্তরাষ্ট্র)
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন