০২:৫০ পি.এম
বাংলাদেশি ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলামের কথিত অপহরণের নাটক অবশেষে কায়রোর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। দেশে এক কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা এড়াতে এবং পাওনাদারদের হাত থেকে বাঁচতেই শরিফুল মিসরে এসে এই অপহরণের নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন বলে আদালতে ও তদন্তকারীদের কাছে নিজেই স্বীকার করেছেন।
তবে এই সাজানো ঘটনার কারণে মিসরের ন্যাশনাল সিকিউরিটির চিরুনি অভিযানে চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন নিরীহ বাংলাদেশি প্রবাসী।
ঋণের বোঝা এড়াতে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ততার’ নাটক
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বুড়াপাড়া গ্রামের আয়নাল হকের ছেলে শরিফুল ইসলাম দেশে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু ব্যবসায়িক লোকসানের কারণে তিনি প্রায় এক কোটি টাকারও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পাওনাদারদের হাত থেকে বাঁচতে তিনি মিসরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তাকে মিসরে আসার ব্যাপারে সহযোগিতা করেন নাসিমা আক্তার নামের এক নারী।
সে সময় শরিফুল অভিযোগ করেছিলেন, প্রায় ছয় মাস আগে ঢাকার কাস্টমস অফিসে মিসরপ্রবাসী নাসিমা আক্তার নামে এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই নারী মিসর থেকে কমলা, খেজুর, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির ব্যবসার সুযোগ রয়েছে বলে তাকে জানান। একইসঙ্গে দূতাবাস থেকে ভিসার প্রয়োজন নেই জানিয়ে শ্রীলঙ্কা হয়ে ‘ওকে-টু-বোর্ড’ ভিসায় কায়রো আসার পরামর্শ দেন এবং সব ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
শরিফুলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, পরিকল্পনা ছিল মিসরে পৌঁছানোর পর তিনি নাসিমাকে যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ বাবদ পেমেন্ট করবেন। কায়রো এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর নাসিমার পরিচিত ব্যক্তিরা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। নাসিমা তাকে রান্না করে খাওয়ান এবং পরদিন সকালে একটি কারখানায় কাজের ব্যবস্থাও করে দেন। কিন্তু পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পেমেন্ট না করে, ওই রাতেই (রাত ২টায়) সাদাত সিটির বেলকু ফ্যাক্টরি থেকে কৌশলে পালিয়ে যান শরিফুল।
পরবর্তীতে এই প্রতিবেদক ও কায়রো আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে শরিফুল স্বীকার করেন যে, তিনি ভেবেছিলেন মিসরে গিয়ে অপহরণের নাটক সাজালে দেশের পাওনাদাররা তাকে ভুলে যাবে এবং নিজেকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত প্রমাণ করে তিনি পার পেয়ে যাবেন।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
ভুল তথ্যে কায়রো গোয়েন্দা বাহিনীর চিরুনি অভিযান
শরিফুল পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশে অভিযোগ দায়ের করলে কায়রোর গোয়েন্দা বিভাগ (আমান উদ দৌলা) মাদি এলাকায় একটি চিরুনি অভিযান চালায়। শরিফুল আরবি ভাষা না জানায়, অভিযানের সময় তিনি যাকে দেখেই ইশারা করেছেন বা মাথা নাড়িয়েছেন, তাকেই পুলিশ আটক করে। এভাবে মোট ৭ জন নিরীহ বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে ৩ জনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও বাকি ৪ জনকে মাদি থানায় আটকে রাখা হয়।
পরবর্তীতে শরিফুলসহ আটককৃতদের কায়রো ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে হাজির করা হলে আদালত সবাইকে জামিন দেন। তবে বিদেশি নাগরিক হওয়ায় থানা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে মিসরের ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি’ বা জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। কায়রোর ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট কথিত বাদী শরিফুলের মিথ্যাচারের জন্য তাকে বড় অঙ্কের জরিমানা করতে চাইলে এই প্রতিবেদকের বিশেষ অনুরোধে আদালত জরিমানামওকুফ করে তাকে অবিলম্বে দেশত্যাগের নির্দেশ দেন।
নেপথ্যে ছিল মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চিঠি
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
এই পুরো ঘটনার পেছনে প্রভাব বিস্তার করেছিল ঢাকা থেকে পাঠানো একটি সরকারি সুপারিশনামা। শরিফুলের আপন মামাতো ভাই, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এবং পরিচালক (প্রশাসন ও উন্নয়ন) মো. সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে দাবি করা হয়েছিল, কুষ্টিয়ার শরিফুলকে কায়রো বিমানবন্দর থেকে ৪-৫ জন বাংলাদেশি অপহরণ করেছে এবং তার সঙ্গে থাকা ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে দেশে পাঠানোর সুপারিশ করা হয় চিঠিতে। এই চিঠির পরই নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাস স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করলে মিসরের ন্যাশনাল সিকিউরিটি তদন্তে নামে এবং শরিফুলকে সহায়তাকারী নিরীহ প্রবাসীদের গ্রেফতার করে।
শেষরক্ষা হলো না নির্দোষ প্রবাসীদের, সবারই ভিসা বাতিল
এই মিথ্যা অপহরণ নাটকের বলি হয়ে শেষ পর্যন্ত চারজন প্রবাসীকেই মিসর ছাড়তে হয়েছে। গত ৮ জুলাই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে শরিফুল ইসলামসহ অভিযুক্ত সাজানো অপহৃতা নাসিমা আক্তার এবং শফিকুল ইসলাম রিপন নামের এক শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠায় মিসরের ন্যাশনাল সিকিউরিটি। বেলকু ফ্যাক্টরির বাংলাদেশিদের দায়িত্বশীল ‘মুদির’ (ম্যানেজার) জজ মিয়াকে তদন্তের স্বার্থে রেখে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ১৪ জুলাই তাকেও মিসরে বৈধ বসবাসের অনুমতি (বিজনেস ভিসা) বাতিল করে বাংলাদেশে ডিপোর্ট করা হয়।
শরিফুলের ইউ-টার্ন
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
মিসর ত্যাগ করার দিন শরিফুল ইসলাম একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ঘটনার দায় স্বীকার করে বলেন, আসলে এসব নাটক করার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। এক গণমাধ্যমকর্মীর খপ্পরে পড়ে আমি এই ভুল কাজগুলো করেছি। আমি আমার ভুলের জন্য সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।
নীরব ভূমিকায় বাংলাদেশ দূতাবাস
পুরো ঘটনার বিষয়ে এবং সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চিঠির ভিত্তিতে নির্দোষ প্রবাসীদের হয়রানি ও বিতাড়নের বিষয়ে জানতে কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রধান আতাউল হক এবং কাউন্সিলর জাকির হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তারা কল ধরেননি এবং পরবর্তীতে খুদে বার্তারও কোনো জবাব দেননি।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন