০৭:১৯ পি.এম
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য আজীবন হাহাকার এবং বেঁচে থাকার আদিম সংগ্রাম। বন্যা কিংবা জলোচ্ছ্বাস ঘটলে দক্ষিণের এই জনপদে বারবার শুধু দুর্যোগের নাম বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের নিয়তি কখনও বদলায় না।
প্রতি বছর জোয়ারের পানি ও বন্যার করাল গ্রাসে হাজার হাজার ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, কৃষকের ফসলের মাঠ তলিয়ে যায়। অভিযোগ উঠে, সংকটকালীন সময়ে সুপেয় পানি এবং খাদ্যাভাব মেটাতে যখন স্থানীয় অসহায় মানুষগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে ছোটেন, সেখানেও তাদের অবকাঠামোগত নানা সংকট ও চরম ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়।
মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে, উপকূলের এসব মানুষের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায় সাইক্লোন শেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো। কিন্তু বাস্তবে সেখানেও কোনো স্বস্তি নেই। বিশেষ করে এর মধ্যে কিছু আশ্রয়কেন্দ্রের ভবন জরাজীর্ণ এবং ব্যবহারের অনুপযোগী; আবার কোথাও আলো-বাতাসhীন দমবন্ধ পরিবেশ। এতে বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের জন্য পরিস্থিতি আরও কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঝড়-বন্যা আসলেই আমরা আতঙ্কিত থাকি। আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে দেখা যায় পানির কল নষ্ট, বাথরুম ব্যবহারের উপায় নেই। সেখানে আলোর অভাব এবং বাতাসের অভাব! আমাদের খোঁজ নেয়ার কেউ নেই।’
চরবাড়িয়ার লামছরি গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, ‘বন্যার পানিতে ঘরের চুলা ডুবে যাচ্ছে। সাইক্লোন শেল্টার আমাদের কাছে নেই। বাধ্য হয়েই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গলা পর্যন্ত পানিতে দিন কাটাতে হয়।’
শায়েস্তাবাদের বাসিন্দা মোসাম্মৎ মরিয়ম বেগম বলেন, ‘ত্রাণের বিষয় सुनছি কিন্তু আমরা চরের মানুষ সময়মতো কিছুই পাই না। আশ্রয়কেন্দ্র বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরে। মহিলাদের জন্য কোনো আলাদা নিরাপত্তা নেই। আমরা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।’
দুর্যোগের আগাম বার্তা পৌঁছানো এবং উদ্ধার কাজে উপকূলের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, বরিশাল বিভাগে মোট ৩৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছে তবে বরিশাল জেলা বৈষম্যের শিকার। এখানকার নদীবেষ্টিত ৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের সুরক্ষার জন্য সিপিপির নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা শুনলে চোখ কপালে ওঠার মতো।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
সিপিপির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে মোট সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন ৩২ হাজার ৭০০ জন। এর মধ্যে ভোলা জেলায় ১৩ হাজার ৮৬০ জন, পটুয়াখালীতে ৮ হাজার ৭০০ জন, বরগুনায় ৮ হাজার ৪৪০ জন এবং পিরোজপুরে ১ হাজার ৭০০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। কিন্তু বরিশাল জেলার ৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলার জন্য সিপিপির তালিকাভুক্ত কর্মী সংখ্যা মাত্র ৬০ জন! জেলাভিত্তিক এই বিশাল বৈষম্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।
লোকবল সংকটের বিষয়ে সিপিপি বরিশাল জেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সোহাগ হোসেন জানিয়েছেন, ‘বরিশাল জেলা সদর এলাকায় বর্তমানে তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা ৬০ জন। নদীবেষ্টিত ৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলার বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং নতুন করে স্বেচ্ছাসেবক নিবন্ধনের প্রক্রিয়া জোরদার করার চেষ্টা করছি, যাতে দ্রুত এই শূন্যতা পূরণ করা যায়।’
তবে মাঠপর্যায়ের এমন সংকটস্বত্ত্বেও প্রশাসনের দাবি, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। বরিশাল জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রনজিত কুমার সরকার বলেন, ‘যেকোনো দুর্যোগ ও জরুরি সংকট মোকাবিলায় সরকারের পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ মজুত রয়েছে। বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করা হচ্ছে, যাতে দুর্যোগকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ কষ্ট না পায়।’
বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করে বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. সোহরাব হোসেন জানান, ‘দুর্যোগ মোকাবিলায় সমগ্র বরিশাল বিভাগে সাড়ে তিন হাজার সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আপদকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে ৪৭০ মেট্রিক টন ত্রাণ সামগ্রী মজুত রয়েছে।’
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
তিনি আরও বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যার যে তারতম্য রয়েছে, তা সমন্বয় করে যেখানে লোকবল কম, সেখানে পার্শ্ববর্তী ইউনিটের মাধ্যমে উদ্ধার কাজ পরিচালনার গাইডলাইন রয়েছে। আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন