০৯:২২ পি.এম
বাংলাদেশের দুগ্ধ খাতে ব্রুসেলোসিস এক নীরব কিন্তু বৃহৎ অর্থনৈতিক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত দুগ্ধবতী গাভীর দৈনিক গড়ে প্রায় এক লিটার দুধ উৎপাদন কমতে থাকে। প্রায় ২ হাজার ৭০০ গাভীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এর ফলস্বরূপ খামারিরা প্রতিবছর প্রায় আড়াই কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একটি গবেষক দল দুই বছর ধরে এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন।
সরকারের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)-এর অর্থায়ন এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহযোগিতা নিয়ে এই গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী অ্যানিমেল ডিজিজ-এ প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
গবেষক দল ইউএনবিকে জানিয়েছেন, খামারিরা সাধারণত গাভীর গর্ভপাত হলে ব্রুসেলোসিসের বিষয়ে চিন্তা করেন। তবে লক্ষণহীন সুপ্ত সংক্রমণ থাকলেও গাভী প্রতি দৈনিক গড়ে প্রায় আধা লিটার এবং সক্রিয় সংক্রমণে প্রায় একটি লিটার বা তারও বেশি দুধ উৎপাদন কমতে পারে। ফলে খামারিরা সচেতন না হয়ে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
গবেষকরা সুপারিশ করেন যে, খামারে গর্ভপাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া, গাভী গরম না হওয়া অথবা বারবার প্রজননে ব্যর্থতা দেখা দিলে দ্রুত ভেটেরিনারিয়ানদের পরামর্শ নিতে হবে এবং পরীক্ষা করাতে হবে।
গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের ল্যাবরেটরি অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমান। গবেষক দলে ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক ড. এম আরিফুল ইসলাম, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক ডা. মো. শফিউল আলম, মাস্টার্স শিক্ষার্থী মো. নাজমুল ইসলাম লিজান, বিশ্ব জ্যোতি অধিকারী, শান্তা ইসলাম, আর এস মাহমুদ হাসান এবং মিল্কভিটার ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক মুহাম্মদ আকতারুজ্জামান।
অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমান বলেন, সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত একটি গাভী সুস্থ গাভীর তুলনায় দৈনিক গড়ে ১ দশমিক ০১ লিটার এবং সুপ্ত সংক্রমণে আক্রান্ত গাভী ০ দশমিক ৫৩ লিটার কম দুধ উৎপন্ন করে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানান, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রধান দুধ উৎপাদনকারী অঞ্চলের ১৭টি বড় বাণিজ্যিক খামারের ২ হাজার ৬৯৬টি দুগ্ধবতী গাভীর তথ্য ও দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আধুনিক ল্যাব পরীক্ষার পাশাপাশি ‘বায়েসিয়ান মিক্সড-ইফেক্টস মাল্টিনোমিয়াল রিগ্রেশন’ পদ্ধতি মাধ্যমে গাভীগুলোকে সুস্থ, সুপ্ত সংক্রমণ এবং সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত—এ তিন শ্রেনিতে ভাগ করা হয়েছে।
তিনি জানান, সাধারণত ব্রুসেলোসিসকে শুধুমাত্র ‘সুস্থ’ বা ‘আক্রান্ত’—এই দুটি মাত্রায় বিবেচনা করা হলেও এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো সুপ্ত সংক্রমণকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও বাইর থেকে সুস্থ মনে হচ্ছে, তবুও এ ধরনের গাভীর দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং ভবিষ্যতে রোগটি সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রোগ শনাক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত আধুনিক গাণিতিক বিশ্লেষণে বাকৃবির গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন গ্রিসের থেসালি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ লেফটেরিস মেলেটিস ও পলিক্রোনিস কস্তুলাস।
গবেষণার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় বাণিজ্যিক ডেইরি খামারগুলিতে শুধু ব্রুসেলোসিসের কারণে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লক্ষ টাকার ক্ষতি হতে পারে, যার বড় অংশই দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে হয়।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
ক্ষতি কমানোর উপায় সম্পর্কে অধ্যাপক আনিসুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে পরিকল্পিত গণটিকাদানকে সবচেয়ে লাভজনক পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে প্রতি ১ টাকার বিনিয়োগে গড়ে ৮ টাকা ১৪ পয়সা পর্যন্ত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। তবে আক্রান্ত গরু শনাক্ত করে খামার থেকে বাদ দেওয়ার পদ্ধতি সরকারি ভর্তুকি ছাড়া সাধারণ খামারিদের জন্য ব্যয়বহুল।
গবেষক দলের সদস্য ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শফিউল আলম বলেন, ব্রুসেলোসিস মানুষের জন্যও একটি বিপজ্জনক জুনোটিক রোগ। আক্রান্ত গরুর কাঁচা দুধ পান করা বা সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে এসে মানুষও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্রুসেলোসিস নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চ ঝুঁকির গাভী দ্রুত শনাক্তকরণ, নিয়মিত রোগ নজরদারি, প্রজনন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং বড় খামারের পাশাপাশি ছোট খামারগুলোতে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন