০৪:৫২ পি.এম
চীনের একটি ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় ধরা পড়েছে যে, তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্র) নদীর ওপর নির্মাণাধীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ঠিক তলদেশে একটি সক্রিয় ভূগর্ভস্থ চ্যুতি বা ফল্ট লাইনের অস্তিত্ব রয়েছে।
ভূতাত্ত্বিকরা জানান, হিমালয় অঞ্চলের এই ফল্ট লাইনটি নির্মাণাধীন মেগা বাঁধের কাঠামোগত নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
হংকং-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে’-র তত্ত্বাবধানে মান্দারিন ভাষায় প্রকাশিত ‘সেডিমেন্টারি জিওলজি অ্যান্ড টেথিয়ান জিওলজি’ সাময়িকীতে গত মাসে এই গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন সেন্টার এবং মিডল ইয়ারলুং সাংপো রিভার ন্যাচারাল রিসোর্সেস অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ স্টেশনের চীনা ভূতাত্ত্বিকদের একটি যৌথ দল গবেষণাটি পরিচালনা করেছে।
গবেষকরা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ‘পাইঝেন ফল্ট’ নামের এই ভূগর্ভস্থ ফাটলটি প্লাইস্টোসিন বা বরফ যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। এই সক্রিয়তার ফলে, এটি মেদগ কাউন্টির এই মেগা বাঁধ, সংযোগকারী সড়ক, সেতু, টানেল এবং সামগ্রিক কৃত্রিম জলাধারের কাঠামোর ওপর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়ার কারণে এই চ্যুতিটি চারপাশের শিলাখণ্ডগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলেছে, যার ফলে মাটির ভেতরের স্তরগুলোর ধারণক্ষমতা এবং দৃঢ়তা নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে এই ভঙ্গুর ভিত্তিটি ৬০ হাজার মেগাওয়াটের একটি দানবীয় বাঁধ এবং এর পেছনে জমা থাকা কোটি কোটি গ্যালন পানির অতিরিক্ত ওজন ধরে রাখতে গিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিনিধি দলটি আরও সতর্ক করেছে যে, তিব্বতের পার্বত্য অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি আলগা এবং মাটির কণার ভেতরের বন্ধনও খুব দুর্বল। একবার যখন এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধারে পানি পূর্ণ করা হবে, তখন দীর্ঘস্থায়ী জলীয় সম্পৃক্ততা, ফল্ট লাইনের অবিরত কম্পন এবং ভূমিকম্পের সম্মিলিত প্রভাবে জলাধারের দুই পাশে পাহাড়ে প্রলয়ংকরী ভূমিধস ঘটতে পারে। এই ধরনের ধস সরাসরি বাঁধের মূল পরিকাঠামো ও সেখানে কর্মরত কর্মীদের জীবনকে চরম বিপন্ন করে তুলবে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
গত বছর তিব্বতে এই মেগা বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে চীনের বর্তমান বিখ্যাত থ্রি গর্জেস বাঁধের তুলনায় তিন গুণ বড় এবং এর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা হিসেবে ধরা হয়েছে।
ইয়ারলুং সাংপো নদীটি তিব্বত ছেড়ে ভারতের অরুণাচল ও আসামের ওপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে যমুনা নদী নামে প্রবেশ করছে। এ কারণে ব্রহ্মপুত্রের নীচে অবস্থানরত ভারত এবং বাংলাদেশের জন্য এই মেগা বাঁধটি এখন একটি ‘ভূতাত্ত্বিক টাইম বোমা’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।
চীনা গবেষকদের এই গবেষণা উদ্বেগ আরও অনেক বেশি করে তুলেছে। তারা বলছেন যে, এই বাঁধটি নির্মাণ করা হচ্ছে যেখানে, সেই এলাকটি মূলত হিমালয় সিসমিক বেল্ট বা ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলের ভেতরে যোগাযোগ করছে। এখানে চীন এবং তার আশপাশের অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ঘন ঘন ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে। ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এই অঞ্চলে একটি স্থায়ী এবং শক্তিশালী ভূমিকম্পের বলয় তৈরি হয়েছে।
গবেষকরা কোয়াটারনারি যুগের (২৫.৮ লাখ বছর আগে থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত) টেকটোনিক নড়াচড়ার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, এই পাইঝেন চ্যুতিটি প্লাইস্টোসিন যুগের শুরুতে সৃষ্টি হলেও বর্তমানে হলোসিন যুগে এটি তার সক্রিয়তা বজায় রেখেছে।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
এ ছাড়া প্রাচীন হ্রদের তলানির কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, মাত্র ৯ হাজার ৫০০ বছর আগেও ফাটলটি সক্রিয় ছিল।
গবেষকরা আধুনিক ভূকম্পন সম্ভাবনার প্রমাণ হিসেবে ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিনে সংঘটিত ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের কথাও উল্লেখ করেছেন, যা ফল্ট লাইনের উত্তর প্রান্তে ঘটেছিল।
তারা বলেন যে, ‘আঞ্চলিক ভূমিকম্পের প্রভাবে সহজেই ভূমিধস ও ধস ঘটতে পারে, যা প্রকৌশল স্থাপনা এবং কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য একটি হুমকি’।
সুতরাং বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন যে, যেকোনো সময় এই অঞ্চলে মাঝারি বা বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঘটলে তা তাসের ঘরের মতো বাঁধটিকে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম এবং এই ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম বন্যা ও ভূমিধস পুরো হিমালয় অঞ্চলসহ নীচের বিস্তীর্ণ জনপদকে মাটির নিচে চিরতরে চাপা দিয়ে দিতে পারে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন