০৬:৪৯ পি.এম
রংপুরে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং তার পরিবারের বাকি তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। যখন তিনি ঘটনার বিস্তারিত কীভাবে ঘটেছিল সে বিষয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের ব্রিফ করেন, তখন তার গলা জড়িয়ে আসে। এক পর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেন।
এক পরিবারের চারজনকে হত্যার এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে included নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে নির্বিকার ছিল অভিযুক্তরা। তিনি বলেন, শুধু হত্যাই নয়, চারজনকে হত্যার পরও ঘটনাস্থলে অভিযুক্তরা কীভাবে স্থানান্তরিত হয়েছিল। হত্যার পর অভিযুক্তরা গোসল করে, খেজুর ও শসা খান এবং ইয়াবা সেবনের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়েছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ থেকে।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের অফিসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের নির্মমতার বর্ণনায় তিনি বলেন যে, গ্রেপ্তার দুজন হলেন নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস এবং তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। সিদ্ধার্থ নগরীর পিকে জুয়েলার্সে কাজ করেন এবং মুগ্ধ কাজ করেন সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, 'গণপতি স্যার ছিলেন একজন সম্মানিত লোক। ওনার পরিবারের সঙ্গে কারও কলহ বিবাদ ছিল না।'
এই কথাটি বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পুলিশ কমিশনার এবং তাকে চোখ মুছতে দেখা যায়।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কিনেছিলেন। পরে সীমান্ত নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে তারা ইয়াবা সেবন করেন। রাতের শেষ দিকে তারা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতির বাড়ির ছাদে যান।
সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে বের হন। সেই সময়ে অভিযুক্তরা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রीतিলতা চক্রবর্তী ছাদে আসার সময় সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
এরপর হত্যার নির্মমতা বর্ণনা করতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, 'উনার চিৎকার-চেঁচামেচিতে উনার মেয়ে প্রাপ্তি চক্রবর্তী, বয়স ২৫, সে যখন এগিয়ে আসে, প্রাপ্তি চক্রবর্তীকে তারা খুন করে গামছা পেঁচিয়ে। খুনিদের বক্তব্যে আমি যেটা শুনলাম, প্রাপ্তি চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময়ে তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। একটা প্যাঁচ গলার উপর দিয়ে যায়, একটা প্যাঁচ মুখের উপর দিয়ে যায়। তারা এত জোরে এই রশিটা টান দেয়, তার মুখের চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখটা ঠিকরে বের হয়ে যায়।'
চারজনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট প্রিয়ম চক্রবর্তীকে হত্যার বর্ণনা করতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার পুরোপুরি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এই ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ছিল গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
প্রিয়মের কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে বক্তব্য থামিয়ে দেন পুলিশ কমিশনার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, 'ছোট ছেলেটা যার কথা বললে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র প্রিয়ম। আমার ছেলের বয়সী।'
এরপর কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, 'এই প্রিয়মকে তারা গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করে এবং একপর্যায়ে একটি বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর সকাল হয়ে গেলে তারা প্রিয়মের বাথরুমে গোসল করে। প্রথমে সিদ্ধার্থ গোসল করে পরে মুগ্ধ গোসল করে।'
পুলিশ কমিশনার জানান, গোসল শেষে অভিযুক্তরা ওই বাড়ির ডাইনিং টেবিলে রাখা একটি বৈয়াম থেকে খেজুর ও শসা খান। এরপর সেখানে বসেই তারা আরও একবার ইয়াবা সেবন করেন। শুধু তাই নয়, হত্যার পর আলামত নষ্টের চেষ্টাও করে অভিযুক্তরা। নিহতদের ব্যবহৃত দুটি স্মার্টফোন থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে ফেলতে ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ফোন দুটি চুবিয়ে রাখা হয়।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, 'খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটন করে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষে চার্জসিট দেওয়া হবে। আপনারা আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন।'
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনার জন্য পুরো রংপুরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার পর্যন্ত পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন