০৩:০৩ পি.এম
ইরান বর্তমানে যুদ্ধে প্রবেশ করেছে তৃতীয় ছয় মাসে। যদিও অর্থনীতির ওপর চাপ পড়েছে তবে যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং কবে শেষ হবে, তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকেও কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। তাই তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মূল্য বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে যাতে ওয়াশিংটন কিছু দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
তবে, যুদ্ধের প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ইরান কতদিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে?
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
ইরানের সামরিক শক্তি কি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম?
ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময় নিশানা করা হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া যায়নি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চ্যাথাম হাউজ’ জানিয়েছে, ইরানের কাছে বর্তমানে মৌলিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই।
সময়ের সাথে সাথে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্রা বা ঢেউ ছোট হয়ে এসেছে। তবে যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা শুধুমাত্র ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার উপর নির্ভর করে না। ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা তুলনামূলকভাবে সহজ এবং দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধে নিহত কমান্ডারদের পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে এবং সামরিক কমান্ড কাঠামো এখনও অক্ষুণ্ণ অবস্থায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
এই প্রসঙ্গে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ গায়েদি বলেন, ইরান সম্ভবত দীর্ঘ সময় ধরে উৎক্ষেপণ কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা বজায় রাখতে পারবে, যদিও তার মাত্রা কমতে পারে। তারা হরমুজ প্রণালিতেও বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম।
অধ্যাপক গায়েদি আরও বলেন, তেলের দামের উপর যুদ্ধের প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তেহরানে আশা সৃষ্টি হয়েছে যে, তারা ওয়াশিংটনকে নিজেদের কিছু শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে সক্ষম হবে।
তেহরানের লক্ষ্য হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী এবং অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য একটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। যা চাপ তৈরি করে দেয়ার একটি পন্থা হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সামরিক সীমাবদ্ধতার কারণে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই।
কতদিন টিকবে ইরানের অর্থনীতি?
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরানের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, তাদের নিজস্ব মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর মূল্য হ্রাস এবং ব্যাপক কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার মত একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ২.৭ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং এই অর্থবছরের শেষ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব দেখা গেছে।
এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুনভাবে বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সে দেশে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইরানের শ্রম উপমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্মসংস্থানের দিক থেকে ১০ লাখেরও বেশি পদের উপর যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। শুধু তাই নয়, প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে ২০২৬ সালে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ৫.৪ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি ৬৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
তেহরানে যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে মতভেদ
বর্তমানে, তেহরানের অভ্যন্তরে কোন পন্থা সবচেয়ে উপযোগী সে বিষয়ক মতভেদ রয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় দরকষাকষির দায়িত্বে থাকা দলের প্রধান মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ আগেই সতর্ক করেছেন যে, ইরান যেন কোনোভাবে ‘দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয় সৃষ্টিকারী সংঘাতের’ ফাঁদে না পড়ে। তিনি এই আলাপ-আলোচনার বিরোধিতাকারীদেরও সমালোচনা করেন।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
তবে এই মতপার্থক্য নির্দিষ্টভাবে ‘যুদ্ধের সমর্থক’ এবং ‘শান্তির সমর্থক’ দুই শিবিরে বিভক্ত করা যায় না। এদিকে, মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ জানিয়েছেন যে, তিনি এমন কোনো চুক্তি মেনে নেবেন না যা ইরানের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবে।
ইরানের জনসাধারণ কী ভাবছেন?
যুদ্ধ চালানোর বিষয়ে ইরানের নাগরিকদের মতামত নিয়ে কোনো নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ নেই। সামাজিক মিডিয়া সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম নয়।
তবে এক গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ‘জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স’-এর ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি জানিয়েছেন, এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রর জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক ফ্রন্ট’ হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আতঙ্ক, তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
যুদ্ধ থেকে বেরোনোর কৌশল
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ইরানের আঞ্চলিক পর্যায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলির সঙ্গে বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা চালিয়েছে। তবে ছিন্নমূল সামরিক ঘাঁটিগুলি এবং অবকাঠামো, নৌ-চলাচলের পথে অব্যাহত হামলা সেই প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।
ইরানের কাছে যুদ্ধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি ঘটাতে পারে এমন একটি চুক্তি কেমন হবে এবং কোন পথে পৌঁছানো যাবে, তা সাম্প্রতিক এই সময়ে স্পষ্ট নয়।
যদিও তেহরান প্রমাণ করেছে যে তারা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বড় পরিমাণ মাশুল দিতে বাধ্য করতে সক্ষম। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তারা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় টিকে থাকবে, সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো বিদ্যমান।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন