১২:২২ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাস ধরে উত্তপ্ত ও সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিতে একটি আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলি, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ কিছু দেশ, এই উদ্যোগে এগিয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে।
এর আগে, টেকসই যুদ্ধবিরতি হলে এমন একটি মিশনের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে তারা সম্মতি জানিয়েছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করলেও তারা এখনও এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে চাইছে না।
विश্লেষকদের মতে, নৌ জোট গঠনের উদ্যোগ আটকে থাকার পেছনে ইউরোপীয় দেশগুলোর গভীর সতর্কতা কাজ করছে। তারা এমন একটি অনিশ্চিত সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না, যা তারা শুরু করেনি এবং সমর্থনও করছেনা। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর স্পষ্ট সমর্থন না থাকা ইউরোপীয় দেশগুলোর অনীহা আরও বৃদ্ধি করেছে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট এবং সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের সিনিয়র ফেলো এইচএ হেলিয়ার আল জাজিরাকে বলেন, ‘অন্যদের হয়ে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের খুব বেশি আগ্রহ নেই। বিশেষ করে এর পেছনে যদি আঞ্চলিক দেশগুলোর স্পষ্ট দাবি না থাকে।’
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠনের ধারণাটি প্রথম সামনে আনে যুক্তরাষ্ট্র। মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর পাশাপাশি চীনকেও এই উদ্যোগে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানান।
প্রাথমিকভাবে বেশিরভাগ দেশই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অথবা কোনো স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তবে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তখনও অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খোলা রেখেছিল।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠনের প্রস্তাব নিয়ে প্রচার চালিয়ে যেতে থাকেন। একই সময়ে ট্রাম্পও সংঘাতে ওয়াশিংটনকে পর্যাপ্ত সহায়তা না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সমালোচনা করেন।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আন্তর্জাতিক একটি মিশনের নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এই মিশনের লক্ষ্য হবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মিশনটি হবে “সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও প্রতিরক্ষামূলক।”
এর পরের মাসে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা এই মিশনের অংশ হিসেবে ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। মন্ত্রণালয়ের দাবি ছিল, কয়েক ডজন দেশ এই উদ্যোগকে সমর্থন করছে এবং পরিস্থিতি অনুকূল হলে মিশনটি শুরু হবে।
তবে, কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও উদ্যোগটি কার্যত আটকে আছে। যদিও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ‘সামুদ্রিক স্বাধীনতা এবং অবাধ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার’ বিষয়ে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সম্পূর্ণভাবে একমত’।
ইউরোপের একজন কূটনৈতিক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, হরমুজ প্রণালিতে ‘নৌ চলাচলের স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে একটি বহুজাতিক মিশনের পরিকল্পনা নিয়ে বৃহস্পতিবার 30টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে কারিগরি পর্যায়ে নতুন বৈঠক হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আল জাজিরাকে বলেন, স্ট্রিটিং ‘ভবিষ্যতের বহুজাতিক মিশনের পরিকল্পনা ও সমন্বয়’ নিয়ে আরও আলোচনার আশা করছেন।
তিনি বলেন, ‘মাঠের পরিস্থিতি এবং একটি টেকসই রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর কার্যক্রম শুরু করা নির্ভর করছে।’ তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে যুক্তরাজ্য এখনও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
হেলিয়ার বলেন, হরমুজে নৌ জোট গঠনের উদ্যোগ বিলম্বিত হয়েছে, কারণ ‘রাজনীতি কখনোই কথাবার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স নীতিগতভাবে নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে সমর্থন করতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় দেশগুলো সক্রিয়ভাবে সমর্থন না করলে তারা এমন কোনো অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’
তার মতে, আঞ্চলিক সরকারগুলো যেটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর পদক্ষেপ মনে করে, এমন কোনো নিরাপত্তা কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষেও যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স যেতে চায় না।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা অধ্যয়নের প্রভাষক আমজাদ রশিদ বলেন, ইউরোপের কোনো দেশ এতে যুক্ত হলে তাদের ভূমিকা সম্ভবত সীমিত, শর্তসাপেক্ষ এবং পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক হবে।
রাশিয়ার সঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে আরও ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করতে থাকা ইউরোপ এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘উত্তেজনা কমানো তথা স্থিতিশীলতা’ চায় বলে জানান রশিদ।
তিনি বলেন, ‘ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে। তারা এ বিষয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করেনি। ফলে ইউরোপীয় শক্তিগুলো এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে প্রস্তুত ছিল না এবং এখনো নেই, যে যুদ্ধের পরিকল্পনা বা কাঠামো তৈরিতে তারা অংশ নেয়নি।’
হেলিয়ার মনে করেন, হরমুজে ইউরোপীয় অংশগ্রহণসহ একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক নৌ উপস্থিতি’ এখনও সম্ভব। তবে তিনি বিশ্বাস করেন না, এর চেয়ে ‘আরও শক্তিশালী কোনো জোট’ গড়ে উঠবে।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, ইউরোপের যেকোনো মিশন ইচ্ছাকৃতভাবেই সীমিত থাকবে। এর মূল লক্ষ্য হবে জাহাজ চলাচলে আস্থা তৈরি করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া। এটি যেন বৃহত্তর কোনো নিরাপত্তা অভিযানে পরিণত না হয়, সেদিকেই গুরুত্ব থাকবে।’
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়, সেই জলপথের নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত অবসানের আলোচনায় অন্যতম বড় বিরোধের বিষয় হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই জলপথ দিয়ে অবাধ ও বাধাহীন জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে, ইরান এই জলপথের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। দেশটি জাহাজগুলোকে তাদের অনুমোদিত নির্দিষ্ট রুট দিয়ে চলাচলের নির্দেশ দিতে চাইছে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আতঙ্ক, তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
গত বুধবার (৫ আগস্ট) ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেন, হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনার জন্য ওমানের সঙ্গে একটি নতুন প্রটোকল নিয়ে সমঝোতা “চূড়ান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে” রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা দুই থেকে চার মাস কার্যকর থাকবে। নতুন নির্ধারিত জাহাজ চলাচলের রুটের বড় একটি অংশ ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে এবং অন্য অংশ যাবে ওমানের জলসীমা দিয়ে। একই সঙ্গে বর্তমানে ব্যবহৃত অস্থায়ী রুটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আর কখনো ফিরে আসবে কি না, তাতে তিনি সন্দিহান। ইরান বুঝতে পেরেছে যে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপে ফেলতে পারে। এটি একটি কৌশলগত সম্পদ। আমার মনে হয় না, তারা সহজে এর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন