০১:০৪ পি.এম
দিনের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড় পুরোপুরি সরগরম হয়ে ওঠে। সকাল ৭টা বাজতে না বাজতেই সেখানে ভিড় করেন শতাধিক দিনমজুর। কারও কাঁধে কোদাল, কেউ হাতে বেলচা, আবার কেউ এসেছেন খালি হাতেই। সবার একটাই প্রত্যাশা— আজ যেন অন্তত একটি কাজ মেলে।
স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘শ্রমিকের হাট’ নামে। এখানে বিক্রি হয় না কোনো পণ্য কিংবা গবাদিপশু; বিক্রি হয় মানুষের শ্রম। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত নির্মাণশ্রমিক, রাজমিস্ত্রী, রংমিস্ত্রী, মাটি কাটার শ্রমিক, কৃষিশ্রমিকসহ নানা পেশার দিনমজুররা কাজের আশায় অপেক্ষা করেন। এই সময়ে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক অথবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এসে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক বেছে নেন এবং মজুরি ঠিক করে নিয়ে যান।
শুধু ত্রিশালেই নয়, ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও প্রতিদিন একই চিত্রের দেখা মেলে। সূর্য ওঠার আগেই সেখানে জড়ো হন অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ। যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে, তারা দিনের উপার্জনের নিশ্চয়তা পান। অন্যদিকে যাদের ভাগ্য সহায় হয় না, তাদের ফিরতে হয় শূন্য হাতে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
ত্রিশালের আমিরাবাড়ি এলাকার নির্মাণশ্রমিক মো. বাবুল মিয়া বলেন, প্রতিদিন ভোরে এখানে চলে আসি। কাজ পেলে দিনটা ভালো যায়, আর কাজ না পেলে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। বর্তমানে সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। তবে প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না।
শ্রমিকদের মতে, বর্ষাকালে নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়ে। তবে ধান কাটা বা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি আসে। বছরের বাকি সময়জুড়ে কাজের অনিশ্চয়তা নিয়ে তাদের জীবনযাপন করা এক রকমের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা জানান, দৈনিক আয়ের ওপরই নির্ভর করে পরিবারের সকল খরচ। একটি দিন কাজ না মিললে সংসারে নেমে আসে টানাপোড়েন।
শ্রমিক আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের কোনো মাসিক বেতন নেই। যেদিন কাজ করি, সেদিনই সংসার চলে। কাজ না থাকলে ধারদেনা করেই চলতে হয়।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
আরেক শ্রমিক সম্রাট উদ্দিন বলেন, সকালের সময় সবাই আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কেউ কাজ পেয়ে চলে যায়, আর যারা থেকে যায় তাদের মন খারাপ হয়ে যায়।
প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন ও দক্ষতার ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকরা তুলনামূলকভাবে বেশি পারিশ্রমিক পেলেও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝে মাঝে এখান থেকেই শ্রমিক নিয়ে যাই। এক জায়গায় অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে।
স্থানীয় এক ঠিকাদারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে কিছুটা বেশি পারিশ্রমিক দিতে হয়। তবে আগের তুলনায় এখন কাজের পরিমাণ কমে গেছে।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
এই শ্রমবাজারে তরুণদের থেকে প্রবীণ পর্যন্ত সব বয়সের মানুষকেই দেখা যায়। কেউ ২০ বছরের, কেউ আবার ৬০-এ পৌঁছেছেন। বয়স বাড়লেও জীবিকার সংগ্রাম থেমে নেই। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে প্রতিদিনই তাদের হাজির হতে হয় এই শ্রমের হাটে।
দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র যেন ফুটে ওঠে এই হাটে। স্থায়ী চাকরি, মাসিক বেতন কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই হাজারো মানুষ প্রতিদিন একটি দিনের কাজের আশায় এখানে এসে দাঁড়ান।
সকাল গড়িয়ে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটের ভিড়ও কমতে শুরু করে। যারা কাজ পান, তারা দ্রুত চলে যান নির্মাণস্থল, কৃষিজমি কিংবা মাটি কাটার কাজে। আর যাদের ভাগ্যে সেদিন কাজ জোটে না, তারা নীরবে বাড়ি ফেরেন— পরদিন ভোরে আবারও নতুন আশা নিয়ে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশায়।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন