প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
দিনের আলোর পুরোপুরি ফোটার পূর্ব মুহূর্তে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মহিলা কলেজ মোড় সরগরম হয়ে ওঠে। সকাল ৭টা বাজতে না বাজতেই সেখানে অপেক্ষা করেন শতাধিক দিনমজুর। কারও কাঁধে কোদাল রয়েছে, কারও হাতে বেলচা, আবার কেউ খালি হাতেও উপস্থিত হন। সবার মাঝে একটাই প্রত্যাশা— আজ যেন অন্তত একটি কাজ মেলে।
স্থানীয় জনসাধারণের কাছে এটি পরিচিত ‘শ্রমিকের হাট’ হিসেবে। এখানে কোন পণ্য বা গবাদিপশু বিক্রি হয় না; এখানে মানুষের শ্রমেরই লেনদেন ঘটে। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত নির্মাণশ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, মাটি কাটার শ্রমিক, কৃষিশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা কাজের আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময়ে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আসেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক বেছে নিয়ে যান, মজুরি ঠিক করার পর।
শুধু ত্রিশাল নয়, ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও প্রতিদিন একই দৃশ্য দেখা যায়। সূর্য ওঠার আগেই সেখানে ভিড় করেন অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ। যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে, তারা দিনের উপার্জন নিশ্চিত করেন। আর যারা ভাগ্য সহায় হয় না, তাদের শূন্য হাতেই ঘরে ফিরতে হয়।
ত্রিশালের আমিরাবাড়ির নির্মাণশ্রমিক মো. বাবুল মিয়া বলেন, প্রতিদিন ভোরে এখানে এসে হাজির হই। কাজ পেলে দিনটি ভালো যায়, আর না পেলে বাড়ি ফিরতে হয়। বর্তমানে সাধারণ শ্রমিকদের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না।
শ্রমিকদের মতে, বর্ষাকালে নির্মাণকাজ কমে যাওয়ার কারণে কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। তবে ধান কাটা বা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। বছরের অন্যান্য সময় তারা কাজের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটান।
তাদের মন্তব্য অনুযায়ী, দৈনিক আয় তাদের পরিবারের সকল খরচের উপরে নির্ভর করে। একটি দিন কাজ না মিললেই সংসারে সমস্যা দেখা দেয়।
শ्रमিক আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের কোন মাসিক বেতন নেই। যেদিন কাজ করি, সেদিনই সংসার চলে। কাজ না থাকলে ধারদেনা করেই চলতে হয়।
আরেক শ্রমিক সম্রাট উদ্দিন বলেন, সকালে সবাই আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কেউ কাজ পেয়ে চলে যায়, আর যারা অপেক্ষা করেন, তাদের মন খারাপ হয়ে যায়।
প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন এবং দক্ষতায় ভিত্তি করে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকরা তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক পেলেও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেই।
ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝে মাঝে এখান থেকেই শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে অনেক শ্রমিক এক জায়গায় পাওয়া যায়, তাই সময়-saving হয়।
স্থানীয় একজন ঠিকাদারের ভাষ্য হলো, অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে কিছুটা বেশি পারিশ্রমিক দিতে হয়। তবে আগের তুলনায় এখন কাজের পরিমাণ কমে গেছে।
এই শ্রমবাজারে তরুণ থেকে প্রবীণ— সব বয়সের শ্রমিককেই দেখা যায়। কেউ ২০ বছরের, কেউ আবার ৬০ ছুঁইছুঁই। বয়স বাড়লেও জীবিকার সংগ্রামে তারা থামে না। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে প্রতিদিনই তাদের হাজির হতে হয় এই শ্রমের হাটে।
দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র যেন ফুটে ওঠে এই হাটে। স্থায়ী চাকরি, মাসিক বেতন কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই হাজারো মানুষ প্রতিদিন একটি দিনের কাজের আশায় এখানে এসে দাঁড়ান।
সকাল গড়িয়ে সময় বাড়ার সাথে সাথে হাটের ভিড়ও কমতে থাকে। যারা কাজ পান, তারা ছুটে যান নির্মাণস্থল, কৃষিজমি কিংবা মাটি কাটার কাজে। আর যাদের ভাগ্যে সেদিন কাজ জোটে না, তারা নীরবে বাড়ি ফেরেন— পরদিন ভোরে আবারও নতুন আশা নিয়ে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশায়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন