০৩:৩১ পি.এম
এক বছর আগে ঢাকার ধামরাইয়ে নারগিস বেগম ও তার দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর খাবারে বিষক্রিয়ার কথা প্রকাশ পায়। এই কারণে মামলাটি অপমৃত্যুর হিসেবে সমস্যামূলক হয়। কিন্তু একটি নতুন তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তার মনে সংশয় সৃষ্টি হয়। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এই হত্যা মামলা প্রকাশ্যে আসে। বর্তমানে নারগিসের মেয়ের স্বামী মো. রবিন আসামি হয়ে বিচারাধীন রয়েছে।
রবিন (২২) বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তিনি বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গত ১৪ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনজুর রহমান ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। মামলাটি এখন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘরজামাই রবিন শ্বশুরবাড়ির ডেকোরেটারের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। তবে তার শাশুড়ির ব্যবসাটি বিক্রি করে দেওয়ার কারণে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শুরুতে এই মামলার কোনো ক্লু ছিল না। রবিন অত্যন্ত সুকৌশলে বিষয়টি চালাচ্ছিলেন। মূলত একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুরো হত্যাকাণ্ডের রহস্য সামনে আসে।
২০২৫ সালের ২ জুন দিবাগত রাতে ধামরাই উপজেলার গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের রক্ষিত গ্রামে মৃত রাজা মিয়ার স্ত্রী নারগিস (৪২) এবং তার দুই ছেলে মো. শামীম (১৭) ও সোলাইমানের (৮) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নারগিসের মেয়ে নাসরিন আক্তার সে সময় জানিয়েছিলেন, ঘরের ভেতরে বিছানার ওপর কাঁথা জড়ানো অবস্থায় ছিল তার মা ও ভাইয়ের মরদেহ। নারগিসের পরিবার তখন ধারণা দিয়েছিল খাবারে বিষক্রিয়াই এই মৃত্যুর কারণ।
এছাড়া সম্পত্তির বিরোধের কারণে শ্বশুরবাড়ির লোকজন খাবারে বিষ মিশিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছিল। নাসরিনের স্বামী রবিনও তখন এই দাবি করেছিলেন। তিনি জানান, রাতে ডিম-ভাত কিংবা জুসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তিনজনকে মারা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় প্রশাসনের তৎপরতা: বিভাগীয় কমিশনার
পুলিশ প্রথমে খাবারে বিষক্রিয়ার সন্দেহে সেদিন অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। কিন্তু দুই দিন পর ৪ জুন মামলার তদন্তভার নেন ঢাকা জেলা পিবিআই কর্মকর্তা মনজুর রহমান।
তদন্ত শুরু করে মনজুর রহমান জানতে পারেন, সেদিন রবিন ও তার স্ত্রী-সন্তানও নারগিসের বাড়িতে রাতের খাবার খেয়েছিলেন। তখন তার মনে প্রশ্ন ওঠে, একই খাবার খেয়ে কেউ মারা গেলেন, আবার কেউ বেঁচে থাকলেন কীভাবে?
মনজুর রহমান জানান, শুরু থেকেই বিষক্রিয়ার তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। মোবাইল ফোনের অবস্থান, ঘটনাস্থলের আলামত, জব্দ করা মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর রবিনকে সন্দেহের তালিকায় আনা হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, সন্ধ্যা রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে রবিন নিজ বাড়িতে ফিরে যান। কিন্তু তার মুঠোফোনের অবস্থান বিশ্লেষণ করে জানা যায়, রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে তিনি আবার শ্বশুরবাড়িতে যান।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে শ্বশুরবাড়ি ছাড়ার পর গভীর রাতে রবিনের ঘটনাস্থলে উপস্থিতির তথ্যই তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, রবিন শাশুড়িকে কোনো হিসাব দিতেন না। তাই শাশুড়ি তাকে না জানিয়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় ব্যবসাটি বিক্রি করে দেন। এ কারণেই রবিন খুব ক্ষুব্ধ হন এবং শ্বশুরবাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে চলে যান।
সালিশে ব্যবসা বিক্রির টাকা নিয়ে রবিনের স্ত্রী নাসরিনের সঙ্গে তার মায়ের কথোপকথন হয়। এর ফলে শাশুড়ির প্রতি রবিনের ক্ষোভ আরও বাড়ে। রাতে খেয়ে স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও মধ্যরাতে আবার শ্বশুরবাড়িতে ফেরেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রবিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, সে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শ্বশুরবাড়ির লোকদের নিয়ে তার সঙ্গে বড় শ্যালক শামীমের মাঝে ঝগড়া ছিল। তাই সকলের ওপর তার ক্ষোভ ছিল।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঘরজামাই রবিন শ্বশুরবাড়ির ডেকোরেটর ব্যবসা দেখাশোনা করতেন এবং তার প্রতিশোধ নিতেই শাশুড়ি ও শ্যালকদের হত্যা করেন রবিন।
সে জানিয়েছে, গভীর রাতে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রথমে বড় শ্যালক শামীমের মুখে বালিশ চেপে ধরতে গিয়ে তাকে হত্যা করে। পরে একই কায়দায় শাশুড়ি নারগিস ও সোলাইমানকে হত্যা করে। তিনজনের মরদেহ একই খাটের উপর কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখে, যাতে মনে হয় তারা ঘুমিয়ে আছেন।
রবিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তা দুটি বালিশ এবং মুঠোফোন উদ্ধারের কথা জানান।
রবিনের বাড়ি থেকে তার শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব বেশি নয়; মাঝে দুটি গ্রাম রয়েছে। তাই তার যাতায়াতের সুযোগ ছিল।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
মরদেহ উদ্ধারের পর রবিন শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে নিজেই সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিষক্রিয়ার গল্প বলেছিলেন। তিনি শ্বশুরের সৎভাইকেও দোষারোপ করেন।
স্বামী রবিনই মা-ভাইদের হত্যা করেছেন কি না, তা নিয়ে এখনও সন্দিহান নাসরিন আক্তার। নাসরিন গণমাধ্যমকে বলেন, রবিন মেরেছে কি না, আমি জানি না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছি। সে আমাকে বলেছে যে সে আমার মা ও ভাইকে মারেনি। রবিন মেরেছে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। তিনি বলেন, পুলিশের ভয়ে সে জবানবন্দি দিয়েছে আদালতে।
তবে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা নিয়ে স্বামীর দ্বন্দ্ব ছিল বলে স্বীকার করেছেন নাসরিন। তিনি জানান, এই কারণেই তার মা ডেকোরেটরের ব্যবসা বন্ধ করে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
নাসরিনের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান বলেন, প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিয়ে করেছিলেন নাসরিন ও রবিন। নাসরিন শুরু থেকেই রবিনকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তবে তদন্ত ভিন্ন তথ্যই দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: হাসপাতালের টয়লেট নিজ হাতে পরিষ্কার করলেন এমপি খোকন
মামলাটি নিহত নারগিসের ভাই আবদুর রশীদ দায়ের করেছিলেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি ওই খুনির ফাঁসি চাই। আমার বোন ওই খুনিরে খুব ভালোবাসত। কিন্তু ওই (রবিন) আমার বোন-ভাগনেরে খুন করে ফেলল।
এই মামলার একজন সাক্ষী শাহিনুর রহমান দোষীর শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেছেন, একসঙ্গে একই পরিবারের তিনজন খুন হওয়ার ঘটনা এলাকায় ভীতি ছড়িয়ে ছিল। তাই দোষীর শাস্তি হওয়া দরকার।
তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান জানান, ১৪ জনের সাক্ষ্য এবং তথ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে গত ১৪ জানুয়ারি তিনি আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে রবিনকে একমাত্র আসামি করা হয়।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন