০৩:৩৫ পি.এম
দীর্ঘদিন মাদরাসায় অনুপস্থিত থেকে একজন সহকারী অধ্যাপকের সহযোগিতার মাধ্যমে ছয় মাসের বেতন পেয়েছেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী যুব মহিলা লীগের নেত্রী শাহনাজ বিউটি।
অভিযুক্ত শাহনাজ বিউটি উপজেলার ভাংনী আদমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী যুব মহিলা লীগের রংপুর মহানগর কমিটির সভানেত্রী।
জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করা, নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, শিক্ষাগত সনদে অসংগতির অভিযোগ এবং অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিতে বেশ কিছু দিন ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ২৬ মামলার পলাতক আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘মেরিল সুমন’ গ্রেপ্তার
বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করার জন্য ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তর, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট মাদরাসার বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব নথিতে শাহনাজ বিউটির নিয়োগ, চাকরির অবস্থান, বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সম্পর্কে একাধিক নানা তথ্য উঠে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, শাহনাজ বিউটি ২০০৩ সালের ১ মার্চ ভাংনী আহমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসায় ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তার নিয়োগের আগে ২০০২ সালের আগস্টে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং নির্ধারিত ফলাফলের শর্ত উল্লেখ ছিল। কিন্তু তার স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফল তৃতীয় বিভাগ হওয়ায় তিনি তৎকালীন যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এছাড়া জানা গেছে, ২০০৮ সালের পর শাহনাজ বিউটি সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে যুব মহিলা লীগের রংপুর মহানগর কমিটির নেতৃত্বে আসেন। অভিযোগ করা হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পর থেকেই তিনি নিয়মিত মাদরাসায় ক্লাস নিতেন না। বরং বেতন উত্তোলনের সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তার কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে আসতেন। এই কারণে ইংরেজি বিভাগের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছিল এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল। তবে সে সময়ে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ২০২৩ সালে নতুন অধ্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করার পর। ওই বছর শিক্ষার্থীরা লিখিতভাবে অভিযোগ করেন যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে গভর্নিং বডি প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দুটি পৃথক কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও শাহনাজ বিউটির পক্ষ থেকে কোনও জবাব পাওয়া যায়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
আরও পড়ুন: একুশে বইমেলার তারিখ ৭ জানুয়ারি ২০২৭ ঘোষণা
তদন্ত কমিটি নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম, শিক্ষাগত সনদে অসংগতি, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ আটটি বিষয় উল্লেখ করে তাকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করে। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গভর্নিং বডি তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। তার পরের দিন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে তিনি কর্মস্থলে ফিরে আসেননি বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে, জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় শাহনাজ বিউটির বিরুদ্ধে দুটি মামলার তথ্যও নথিতে দেখা যায়। একটি মামলায় তাকে হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে এবং অন্যটিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় আসামি করা হয়েছে। তবে এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শাহনাজ বিউটি এক দিনের জন্য মাদরাসায় যান এবং সেদিন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করেই চলে যান। তখন অধ্যক্ষ এবং কয়েকজন শিক্ষক তাকে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে তিনি অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন এবং মামলায় সাবেক অধ্যক্ষসহ কয়েকজনকে সাক্ষী করা হয়। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর এবং দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি শাহনাজ বিউটির নামে ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয় সহকারী অধ্যাপক আকরামুল ইসলামের দ্বারা।
আরও পড়ুন: ধামরাইয়ে পরিত্যক্ত গোডাউনে আগুন, ৫ লাখ টাকার সম্পদ উদ্ধার
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো কমিটি না থাকায় শিক্ষকদের বেতন ছয় মাস বন্ধ ছিল। এর মধ্যে, বেতনের জন্য সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আকরামুল ইসলাম হাইকোর্টে রিট করলে, জরুরি ভিত্তিতে বেতন-ভাতা প্রদানের আদেশ প্রদান করে আদালত। এ সময় সহকারী অধ্যাপক আকরামুল ইসলাম শাহনাজ বিউটির সাময়িক বরখাস্ত এবং দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে বেতন শিটে নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে নাম দাখিল করে তার ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে দেন।
এদিকে, একদিকে দ্বৈত বেতন শিটের মাধ্যমে জালিয়াতি করে ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়, অপরদিকে সেই সময়টি তাকে বিনা বেতনের ছুটিতে দেখানো হয়। তবে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির শর্তাবলি অনুযায়ী রোগ বা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত দীর্ঘমেয়াদি ‘বিনাবেতনের ছুটি’ অনুমোদনের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে শাহনাজ বিউটির ক্ষেত্রে সেই বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমান অধ্যক্ষ আবু ছালেহ মোহাম্মদ জাকারিয়া গণমাধ্যমকে জানান, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শাহনাজ বিউটিকে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তা না করেই উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন অনুপস্থিতের পর প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বেতন ও বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া হয়েছে, যার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা ও প্রশাসনিক— উভয় ক্ষেত্রেই সংকটে পড়েছে। তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অন্যদিকে সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আকরামুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শাহনাজ বিউটির ছয় মাসের বেতন এবং পরবর্তী ছুটির বিষয়গুলো জেলা প্রশাসন ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের জ্ঞাতসারে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসাসহ অন্যান্য কারণে তাকে ছুটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, পুলিশ উদ্ধার অভিযান
রংপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েন হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, ওই মাদরাসার সভাপতি রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) শরিফুল ইসলাম। মাদ্রাসার বেতন-ভাতাসহ সার্বিক বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানের সভাপতি দেখভাল করেন। এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এডিসি (শিক্ষা) স্যারকে অভিযোগ করলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অভিযোগ পেলে আমি নিজে পরিদর্শনে যাব।
এ বিষয়ে বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) শরিফুল ইসলাম জানান, শাহনাজ বিউটিকে ছয় মাসের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার দায়িত্বকালীন সময়ে হয়নি। কিন্তু শাহনাজ বিউটির দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি তার জানা রয়েছে। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত কীভাবে তাকে ধারাবাহিকভাবে ‘বিনা বেতনের ছুটিতে’ দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর চিকিৎসাজনিত আবেদনের ভিত্তিতে সীমিত সময়ের জন্য ছুটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল; এর আগের সময়ের সম্পর্কে তিনি অবহিত নন।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন