প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
কুমিল্লার গোমতী নদীর উত্তর তীরে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো নুরজাহান মসজিদ সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাস, জনশ্রুতি এবং অবহেলায় জীর্ণ এই স্থাপনাটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। বিশাল বটগাছের শেকড় যেন মসজিদটির অস্তিত্বকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই মসজিদে কোনো দিন আজান দেওয়া হয়নি। এমনকি জামাতের সঙ্গে নামাজও আদায় হয়নি। কারণ, এর নির্মাতা ছিলেন ত্রিপুরা মহারাজা দ্বিতীয় ধর্ম-মানিক্যের রাজদরবারের একজন নর্তকী।
অবহেলায় ক্ষয়ে যাওয়া এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে রক্ষায় স্থানীয়দের সাথে সক্রিয় হয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ভূমির তফশিল নির্ধারণের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছে সংস্থাটি। একই দাবিতে আবেদন করেছেন শিক্ষানুরাগী মোশাররফ খান চৌধুরী।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, গোমতীর উত্তরপাড়ের মাঝিগাছা গ্রামে তিন বোন— নুরজাহান, মোগরজান ও ফুলজান বাস করতেন। শৈশবে সাপে কাটা নুরজাহানকে ভেলায় তুলে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার পর ত্রিপুরা রাজদরবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার পর রাজদরবারের মেনেকার তত্ত্বাবধানে তিনি নাচ-গান শেখেন এবং সময়ের অন্যতম খ্যাতিমান নর্তকীতে পরিণত হন।
দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর রাজদরবারে কাটানোর পর তিনি মধ্যবয়সে নিজ গ্রাম মাঝিগাছায় ফিরে আসেন। একজন জমিদারের বিধবা স্ত্রী পরিচয়ে জীবনের পদযাত্রা শুরু করেন। বিদায়ের সময় ত্রিপুরার মহারাজা তাকে কিছু একর জমি, বিপুল অর্থ ও স্বর্ণালংকার উপহার দেন। সেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে তিনি গ্রামের মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসেন। অতীত জীবনের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ১৭১৪ থেকে ১৭৩৪ সালের মধ্যে তিনি নির্মাণ করেন একটি মসজিদ।
মসজিদ নির্মাণ শেষের পর নামাজ শুরুর দিন নির্ধারণে গ্রামবাসীকে নিয়ে বৈঠক করার উদ্যোগ নেন নুরজাহান। কিন্তু তার পূর্বে তার অতীত জীবন নিয়ে এলাকায় আলোচনা শুরু হয়ে যায়। পরে গ্রামের প্রভাবশালীরা সিদ্ধান্ত নেন, তার অর্থে নির্মিত মসজিদে কেউ নামাজ আদায় করবে না। সেই সিদ্ধান্তই আজও জনশ্রুতির অংশ হয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এরপর থেকে এই মসজিদে আর কখনো আজান দেওয়া হয়নি এবং নামাজও অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নুরজাহান। কয়েক বছর নিভৃতে জীবন কাটানোর পর তিনি এলাকাটি ছেড়ে চলে যান বলে একটি প্রচলিত মত রয়েছে। আবার অন্য একটি জনশ্রুতি বলছে, সামাজিক অপবাদ সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেন। পরে মসজিদের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুমিল্লা নগরীর চাঁনপুর গোমতী সেতু পার হয়ে মাঝিগাছা-নন্দীর বাজার সড়কের বাম পাশে ঐতিহাসিক মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এটি দেখতে এলেও চারপাশে গড়ে ওঠা স'মিল ও দোকানপাটের কারণে স্থাপনাটি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।
মসজিদের গম্বুজের একাংশ ইতোমধ্যে ধসে পড়েছে এবং দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিছু জায়গায় বটগাছের শেকড় ইটের গাঁথুনিকে ভেদ করে নেমে এসেছে। ভেতরে জমে থাকা পানি এবং অযত্নে পুরো স্থাপনাটি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। মসজিদের উত্তর পাশে রয়েছে একটি কবরস্থান।
শিক্ষানুরাগী মোশাররফ খান চৌধুরী বলেন, প্রতিদিন এই পথে যাতায়াতের সময় মসজিদটির করুণ অবস্থা চোখে পড়ে। দ্রুত সংরক্ষণ না করলে এটি একসময় হারিয়ে যাবে। আশপাশের দখল বন্ধ করতে হবে। যদি যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কুমিল্লা কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার সজিব মিয়া বলেন, গোমতী নদীর তীরের এই ঐতিহাসিক মসজিদ প্রত্ন-পর্যটনের সম্ভাবনাময় একটি স্থাপনা। ভূমির তফসিল নির্ধারণের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংরক্ষণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবিএম মশিউজ্জামান জানান, মসজিদের ভূমি নির্ধারণ ও সংরক্ষণসংক্রান্ত আবেদন পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আদর্শ সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন