১০:৫৬ পি.এম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি ও দু’জনকে হত্যার ঘটনার মামলা যুক্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবসহ ৩ জন পুলিশের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রকাশ করা হয়েছে।
এছাড়া একজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরেক আসামিকে ২০ বছরের কারাদণ্ডের বিষয়টি রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন সদস্যের বিচারকের সাক্ষরের পর বুধবার রায়টি প্রকাশিত হয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান (যিনি ইতোমধ্যে চানখাঁরপুলের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন), ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এই তিন আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছে।
এছাড়া রায়ে রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে এবং তিনিও পলাতক আছেন। অন্যদিকে, রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি গ্রেপ্তার আছেন। বুধবার থেকে আগামী এক মাসের মধ্যে সাজাপ্রাপ্তরা আপিল করতে পারবেন।
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সমন্বিত, ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণ করা হয়েছিল। আন্দোলন দমনের জন্য রামপুরায় সংঘটিত হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো রাষ্ট্রীয় নীতির একটি অংশ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা সমন্বিতভাবে এই আন্দোলন দমনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
রায়ে বলা হয়েছে, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে তার অধীনস্তদের উসকানি দিয়েছেন এবং এই হত্যাকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে দুইজনকে হত্যা করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি টেলিফোন আলাপচারিতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন।
রায়ে আরো বলা হয়েছে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমানকে নিয়ে গঠিত একটি কোর কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে বৈঠক করেছেন। সেখানে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা পেয়েছেন এবং পরে সেই নির্দেশ পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছে পৌঁছে দেন।
ট্রাইব্যুনালের মতে, পরে হাবিবুর রহমান বেতার বার্তার মাধ্যমে ডিএমপির সদস্যদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
রায়ে আরো বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বনশ্রী এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালায়। এ সময় রামপুরা থানার কাছে ভাড়া বাসার গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকা সাত বছর বয়সী মুসা খান এবং তার দাদি মায়া ইসলাম একটি গুলিতে আহত হন। গুলিটি মুসার মাথা ভেদ করে মায়ার তলপেটে আঘাত করে। ঘটনার আগে মুসা তার দাদিকে আইসক্রিম কিনে দেওয়ার জন্য বাইরে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে মনে করে তারা পঞ্চম তলা থেকে নিচে নেমে গ্যারেজে আসলে গুলিবিদ্ধ হন।
রায়ে আরো বলা হয়েছে, ঘটনার পর ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান রামপুরা থানায় গিয়ে অভিযানে ভূমিকার জন্য ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমানকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনাল বলেছে, অভিযানের তত্ত্বাবধান করেন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম এবং ওসি মশিউর রহমান। তারা নিজেরাই ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশের নিচে আশ্রয় নেওয়া আমির হোসেনকে পরে এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার আবারও গুলি করেন।
আরও পড়ুন: বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার আপিলের চূড়ান্ত শুনানি ৮ ডিসেম্বর
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন