০৩:৫৬ পি.এম
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘গুণগত ও পরিকল্পিত জনসংখ্যা একটি দেশের প্রধান সম্পদ ও শক্তি। এটি উন্নয়নের ভিত্তি এবং সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। অপরদিকে, অপরিকল্পিত ও অদক্ষ জনসংখ্যা একটি দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’
আজ দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
আরও পড়ুন: ‘আল্লাহর বাড়ি মানুষ যায় পবিত্র নিয়তে, ওখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠিক না’ হুমায়ুন কবিরের মন্তব্য
তিনি আরও বলেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার জনসংখ্যার আকারের ওপর নির্ভর করে না, বরং জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘অদক্ষ ও বেকার জনসংখ্যা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শ্রমবাজার, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দেয়।’
তিনি ভারসাম্যপূর্ণ জনসংখ্যা নিশ্চিত করা এবং এর গুণগত মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অগ্রযাত্রার কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
তিনি বলেন, ‘তার ঘোষিত ১৯ দফা সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তি কর্মসূচির অন্যতম দফা ছিল ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ’। ১৯৭৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ গঠন এবং ‘জনসংখ্যা নীতি’ প্রণয়ন করা হয়।’
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সুফল অর্জনের লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। যার ফলে বাল্যবিবাহ কমে, সচেতনতা ও নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের প্রবণতা বাড়ে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সীমিত ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অবকাঠামোর তুলনায় আমাদের জনসংখ্যার চাপ অত্যন্ত বেশি।
আরও পড়ুন: ক্ষমা চাইলেন ‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক চাই না’ বলা এমপি রতন
এর সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, পরিবেশগত ঝুঁকি, সীমিত বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
এই বাস্তবতায় জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা কেবল পরিবার পরিকল্পনা বা স্বাস্থ্যখাতের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুশাসন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ এবং এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। অর্থনীতির ভাষায় যা জনমিতিক লভ্যাংশ।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং চীনের মতো বহু দেশ এই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য। তাই আজকের তরুণদের আগামী দিনের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
আর তা করতে না পারলে এই সম্ভাবনাই একসময় বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কাজেই মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
তিনি বলেন, ‘আমি আনন্দিত যে এ বছরের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’ যা তারুণ্যের প্রত্যাশা ও জাতীয় অগ্রাধিকার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
রাষ্ট্রপতি এ প্রতিপাদ্যকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ যুগে বিশ্ব অর্থনীতি ও শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনী দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং কর্মসংস্কৃতির মতো জীবনদক্ষতারও বিকাশ ঘটাতে হবে।
আরও পড়ুন: নারী ও শিশুদের কল্যাণে ইউনিসেফের সঙ্গে অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং শ্রমবাজারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলে এমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যা তরুণদের দেশীয় ও বৈশ্বিক উভয় শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম করে।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের সামনে এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও মোট জনসংখ্যার বিশাল ভিত্তির কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু জন্মগ্রহণ করছে। ফলে দেশের মোট জনসংখ্যা এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, মোট প্রজনন হার গত দেড় দশক ধরে প্রায় দুই দশমিক তিন-এ স্থির রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে এ হারকে দুই এর কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং তা ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় চ্যালেঞ্জ।
তৃতীয়ত, অশিক্ষিত ও পশ্চাৎপদ পরিবারে জন্মহার তুলনামূলক অনেক বেশি। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে সেভাবে ঢেলে সাজাতে হবে।
চতুর্থত, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বিয়ের গড় বয়স বৃদ্ধি এবং কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম সামাজিক অগ্রাধিকার।
এ বিষয়ে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার স্বাস্থ্যকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এবং ‘চিকিৎসার অভাবে কোনো মৃত্যু নয়’ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে।
এই জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অপার সম্ভাবনা।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আজকের সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক বিনিয়োগ এবং সঠিক পরিকল্পনাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তি রচনা করবে।
পরিকল্পিত পরিবার, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন এই ছয়টি ভিত্তিকে সমান গুরুত্ব দিতে পারলেই জনসংখ্যা জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডায়ালাইসিস সুবিধা চালুর সরকারের সিদ্ধান্তকে আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।’
এর আগে রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্য খাতের তৃণমূল পর্যায়ে অবদান রাখা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের মধ্যে ক্রেস্ট ও সনদপত্র বিতরণ করেন।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ও প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং। স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন