০৪:৫১ পি.এম
শিক্ষা সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি বর্তমানে ভারতের একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান শাসক দল বিজেপি নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। এই আন্দোলনের শেষ কোথায় হবে, তা এখনও অজানা। ভারতের কাকরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে।
আন্দোলনরত যুব নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী এবং তাদের সমর্থকদের ওপর পুলিশ চড়াও হইলে আন্দোলন মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আবার হাজারো মানুষ সমবেত হন। তবে, দিল্লির এই আন্দোলন আর সীমাবদ্ধ নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেরালা রাজ্য, যেখানে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী জলকামান ব্যবহার করে।
অন্যদিকে, রাজস্থান থেকে মানুষ এসে দিল্লিতে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভারতীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই দাবি করেছেন এবং আন্দোলনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের অভিযোগ করেছেন।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
সোমবার (২০ জুলাই) আয়োজিত প্রতিবাদে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করেন। তারা পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করেন।
মধ্যাঞ্চলীয় দিল্লি ব্যাপক সহিংসতার সাক্ষী হয়, যখন পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করলে অন্তত ৬০ জন আন্দোলনকারী আহত হন। পুলিশ প্রতিবাদস্থলের মঞ্চ এবং অস্থায়ী তাঁবুগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তাদের ১১৮ জন কর্মী আহত হয়েছেন এবং ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত লাঠি এবং কাঁদানে গ্যাসের বিষয়ে পুলিশ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কোন মন্তব্য করেনি। তবে, বিরোধী দলগুলো তীব্র সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে।
সিজেপি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন, যা চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতের প্রধান বিচারপতির করা মন্তব্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে ওঠে। তিনি সাংবাদিকতা ও অ্যাক্টিভিজমের দিকে ঝুঁকে পড়া বেকার তরুণদের বোঝাতে কাকরোচ (তেলাপোকা) শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এই মন্তব্যের ফলে বহু মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে, প্রধান বিচারপতি পরে ব্যাখ্যা দেন যে, তিনি কেবল ভুয়া ও বানোয়াট ডিগ্রিধারিদের উদ্দেশ্য কর এটি বলেছিলেন।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
সোমবারের বিশাল জনসমাগম প্রমাণ করে যে, সিজেপি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল না হওয়া সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষকে রাজপথে নামাতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবাদকারীরা গত এক মাস ধরে দিল্লির ৩০০ বছরের পুরনো পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ‘জন্তর মন্তরে’ অবস্থান করছেন। ২৮ জুন অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনের সাথে যোগ দিয়ে অননির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন যা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে।
শনিবার পুলিশ তাকে জোরপূর্বক প্রতিবাদস্থল থেকে সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায় যেখানে তিনি এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই আন্দোলন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোদীর বিরুদ্ধে সর্বজনীন অসন্তোষ প্রকাশের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
ওয়াংচুক এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বেশিরভাগ প্রধান বিরোধী দল, কৃষক নেতা, অ্যাক্টিভিস্ট এবং বলিউড তারকা সহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সমর্থন পেয়েছেন।
বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক ছিল এবং তিনি মোদীকে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে যুব-বিরোধী প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।
সোমবারের আগ পর্যন্ত সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনায় বসেনি। অবশেষে সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সিজেপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবি শোনেন।
নাড্ডা, তিনিও ক্ষমতাসীন বিজেপির একজন শীর্ষ নেতা, বলেন, বৈঠকটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি প্রতিবাদকারীদের তাদের অবস্থান কর্মসূচি শেষ করতে এবং প্রশাসনকে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে সহায়তা করার অনুরোধ করেন।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, নাড্ডার সাথে ১০ মিনিটের বৈঠকটি কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস ছাড়া শেষ হয়েছে। সিজেপির আরেক নেতা আশুতোষ রাঙ্কা এই বৈঠকের জন্য চার ঘণ্টা অপেক্ষা করার বিষয়টি সময়ের অপচয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
সোমবার সন্ধ্যায় এক পর্যায়ে মনে হয়েছিল যে সিজেপি হয়তো বৈঠকের পর তাদের প্রতিবাদ স্থগিত করতে রাজি হবে।
কিন্তু দিনভর চলা সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পেলে তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়।
দিনের বেলা প্রতিবাদকারীদের আহতদের জন্তর মন্তরে নিয়ে আসতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে একজন মাথা ফেটে রক্তে ভেসে যাওয়া যুবক ছিলেন, যাকে স্বেচ্ছাসেবক চিকিৎসার ব্যবস্থা করছিলেন এবং অন্য একজনের পা ভেঙে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
প্রতিবাদকারীরা নাড্ডার সাথে সাক্ষাৎ করার সময়েই পুলিশের আধা-সামরিক বাহিনী জন্তর মন্তর খালি করতে আসে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাদা পোশাকের কর্মকর্তা ছিলেন, যাদের অনেকের মুখ ঢাকা ছিল। তারা ইউনিফর্ম পরা পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া করে এবং তাদের লাঠিপেটা করতে শুরু করে।
মাইকে বারবার ঘোষণা হতে থাকে- এখনই চলে যান, এই প্রতিবাদ শেষ।
প্রতিবাদকারীরা আতঙ্কে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, পুলিশ ব্যারিকেড টপকাতে গিয়ে অনেকে মাটিতে পড়ে যান, কেউ কেউ লাঠির আঘাতে আহত হন, ভাই-বোন ও বন্ধুবান্ধবরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং নারীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এই অপারেশন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কয়েক মিনিট পর, তাকে বাইরে পাঠানো হয় যাতে আমাকে পৌঁছে দিতে পারেন।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আতঙ্ক, তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
ইন্টারনেট ফের চালুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নিরাপত্তা বাহিনী নারীদেরসহ প্রতিবাদকারীদের বেধড়ক পেটাচ্ছে এবং অনেকেই অচেতন অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন।
সোমবার রাতে সিজেপি আবারও জন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে এবং সামাজিক মাধ্যমে লেখা হয়: "এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শেষ হচ্ছে না!"
"পুলিশি বর্বরতা সত্ত্বেও সিজেপির সাহসী প্রতিবাদকারীরা ফিরে এসেছে। দিল্লিবাসী, বাইরে আসুন এবং জন্তর মন্তরে আমাদের সাথে যোগ দিন—এটি হয় এখন, না হয় কখনোই নয়! ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে!"—এই ছিল বার্তাটি।
পুলিশ পরবর্তীতে দাবি করে যে, প্রতিবাদকারীরা "উচ্ছৃঙ্খল, আক্রমণাত্মক ও সহিংস আচরণ" প্রদর্শন করেছে এবং বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছে।
পুলিশ আরও জানায়, "প্রতিবাদকারীরা পুলিশ কর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে আক্রমণ করে, ব্যারিকেড ভেঙে ফেলা এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করে।" সিজেপি পুলিশের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রথম আক্রমণকারী হওয়ার অভিযোগ এনেছে।
তাদের সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে আহত বা আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে সমর্থকদের যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়।
"আমাদের সমর্থকদের কাছে, বিশেষ করে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্বারা মারধরের শিকার মেয়েদের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। আমরা আরও ভালো ব্যবস্থা নিতে পারতাম। দিল্লি পুলিশের অমানবিক আচরণ থেকে আপনাদের রক্ষা করতে আমার আরো উদ্যোগী হওয়া উচিত ছিল," দিপকে এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্টে উল্লেখ করেন।
অন্য একটি পোস্টে তিনি জানান, এক আহত নারী সমর্থকের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তিনি তাকে দেখতে হাসপাতালে যাচ্ছেন।
সিজেপি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর জবাবদিহিতার দাবি জানাচ্ছে। ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET)-এর প্রশ্ন ফাঁসের পর তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে তাদের মূল দাবিতে পরিণত করেছে।
৩ মে অনুষ্ঠিত এই মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রায় ২২.৮ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নেন। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের খবর পাওয়ার পর পরীক্ষাটি বাতিল হয়ে যায় এবং কয়েক সপ্তাহ পর পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়।
এই কেলেঙ্কারিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এ পর্যন্ত ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে তাদের পরিবার জানিয়েছে।
প্রতিবাদকারীদের দাবি, প্রধানের এই ফাঁসের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করা উচিত। তবে তিনি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সিজেপি ও তাদের সমর্থকদের "বিশৃঙ্খলা সৃষ্টকারী উপাদানের বি-টিম" আখ্যায়িত করেছেন।
তবে সোমবারের বিশাল জনসমাগম, সহিংসতা এবং সিজেপির অবস্থান না ছাড়ার অনড় মনোভাব এই আন্দোলনকে দীর্ঘ সময় আলোচনার কেন্দ্রে রাখবে বলেই মনে হচ্ছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন