ঢাকা শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ০৭ই কার্তিক, ১৪৩৩বঙ্গাব্দ ১২ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ইং ০৭ই কার্তিক, ১৪৩৩বাং

এআইয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত, বিশ্বজুড়ে বন্ধ বহু ওয়েবসাইট


এআইয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত, বিশ্বজুড়ে বন্ধ বহু ওয়েবসাইট

ঢাকা, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর, সাইবার হামলা প্রতিরোধের জন্য বৃহস্পতিবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে। তারা সম্ভাব্য হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট পরিচালনার জন্য পিএইচপি ব্যবহার করা হয়। সরকারি সেবা, সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট এবং অনলাইন দোকানের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এ প্রোগ্রামিং ভাষার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তা ত্রুটির মধ্যে দুটি গুরুতর দুর্বলতা শনাক্ত করেছে।

আরও পড়ুন: কাতালোনিয়ায় ইসলামফোবিয়ার উত্থানে রাজনীতির সমীকরণ বদলে যাচ্ছে

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তৈরি পিএইচপি নামের প্রাথমিক অর্থ ছিল ‘পার্সোনাল হোম পেজ’। বর্তমানে এর পূর্ণরূপ ‘হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর’। জনপ্রিয় ওয়েবসাইট তৈরির বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের পেছনে এ প্রোগ্রামিং ভাষা কাজ করে।

উইজের একটি ব্লগ পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পিএইচপিতে শনাক্ত হওয়া এই ত্রুটিগুলোকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতাগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এমনকি সফটওয়্যার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর ত্রুটিগুলোর মধ্যেও এগুলো স্থান পেতে পারে।’

বর্তমানে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই মডেলগুলো কম্পিউটার কোডের এমন দুর্বলতা শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে, যা বছরের পর বছর মানুষের নজর এড়িয়ে গেছে।

এ পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে শনাক্ত হওয়া সফটওয়্যার নিরাপত্তা ত্রুটির সংখ্যা গত বছরের রেকর্ডের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে অদ্ভুত স্থাপত্যের পর্যটনস্থল, বিশাল নাগরদোলার চড়ার সুযোগ নেই

‘ভয়াবহ ক্ষতি’ হতে পারে

পিএইচপি প্রোগ্রামাররা বুধবার নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করার জন্য সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তাদের ওয়েবসাইটের সফটওয়্যার অবিলম্বে হালনাগাদ করার নির্দেশ দিয়েছে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমগুলো ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চীন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন কর্তৃপক্ষও একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছে।

অ্যামাজন থ্রেট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশের আগেই তারা একটি হ্যাকিংয়ের চেষ্টা শনাক্ত করেছিল।

প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, হামলাকারী কীভাবে নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগানোর তথ্য পেয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তারা জানিয়েছে, বেনামি একটি ইন্টারনেট সংযোগ থেকে ‘হানিপট’ লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। হানিপট হলো সাইবার হামলাকারীদের কার্যকলাপ শনাক্ত করার জন্য তৈরি একটি কৃত্রিম লক্ষ্যব্যবস্থা।

আরও পড়ুন: সৌদি আরবে আটকে আছে ৪ হাজার ভারতীয় ওমরাহ যাত্রী

তবে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফের পিএইচপি-সংক্রান্ত গবেষণায় যুক্ত রায়ান অস্টিন বিবিসিকে জানিয়েছেন, ‘এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে না যে এই ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে হামলা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।’

যেসব ওয়েবসাইট নিজস্ব সার্ভারে পিএইচপি ব্যবহার করে, সেগুলোই মূলত এ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অনেক বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অন্য প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রযুক্তি দল দ্রুত নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধন করতে পেরেছে, সেগুলোর অনেকেই অনলাইন কার্যক্রম চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের সিডনি ক্যাম্পাসের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক রাহাত মাসুদ এ আবিষ্কারকে ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি এএফপিকে বলেছেন, এ ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হামলাকারীরা কোনো অনুমতি, ব্যবহারকারীর নাম বা পাসওয়ার্ড ছাড়াই সার্ভারে প্রবেশ করতে পারে।

আরও পড়ুন: ট্রাম্প: গুগলকে আটলান্টিকের নাম ‘ট্রাম্প মহাসাগর’ রাখতে বলেছিলাম, রাজি হয়নি

তিনি আরও বলেন, ‘সার্ভারে একবার ঢুকতে পারলে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো যেকোনো কাজ করতে পারে।’ এর মধ্যে সংবেদনশীল তথ্য চুরি করা কিংবা ওয়েবসাইটের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করার মতো কর্মকাণ্ডও রয়েছে।

এ ধরনের ঝুঁকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এআইয়ের সক্ষমতায় ‘নতুন যুগের সূচনা’

অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিমা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অনলাইন সেবাও জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়।

আরও পড়ুন: ইউরোপজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ তরুণেরা

জনপ্রিয় কিছু অ্যাপও সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে পোকেমনভিত্তিক একটি ঘুম পর্যবেক্ষণকারী অ্যাপ রয়েছে। নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের কাজ চলাকালে উইকিপিডিয়া পরিচালনাকারী ফাউন্ডেশনও ব্যবহারকারীদের সম্ভাব্য সেবাবিঘ্নের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

পিএইচপি ভাষার উন্নয়নে অর্থায়নকারী পিএইচপি ফাউন্ডেশন তাদের ব্লগ পোস্টে বলেছে, ‘আপনি যদি পিএইচপি ব্যবহার করেন, তাহলে এখনই সফটওয়্যার হালনাগাদ করা অত্যন্ত জরুরি।’

ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তা প্রকৌশলী ভলকার ডুশ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে পিএইচপি সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যার মুখে পড়েছে।

তিনি ২০১৪ সালে শনাক্ত হওয়া ‘হার্টব্লিড’ নামের নিরাপত্তা ত্রুটির সঙ্গে এর তুলনা করেছেন। ওই ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে সফটওয়্যার হালনাগাদের ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছিল।

আরও পড়ুন: ইউরোপে তীব্র গরমে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ গত আগস্টে ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৫.৬ সল মডেল ব্যবহার করে পিএইচপির কোড নিরীক্ষার সময় ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে। ওপেনএআইয়ের অর্থায়নে পরিচালিত নিরাপত্তা নিরীক্ষার অংশ হিসেবে এ কাজ করা হয়।

ওপেনএআই বলেছে, ‘এই আবিষ্কার এমন এক নতুন পর্যায়ের সূচনা করছে, যেখানে এআই ইন্টারনেটের বিশাল পরিসরে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করতে সক্ষম।’

গুগলের মালিকানাধীন উইজ জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহ পর তাদের পক্ষ থেকেও স্বাধীনভাবে একই ত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছে। এ কাজে গুগলের জেমিনি ৪ আর্গন এবং জিপিটি-৫.৬ সলসহ একাধিক এআই মডেলের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল।

সংশোধিত সংস্করণ তৈরির জন্য ত্রুটিগুলোর বিষয়ে আগেই গোপনে পিএইচপির উন্নয়নকারীদের জানানো হয়েছিল। নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তথ্যগুলো গোপন রাখা হয়।

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের জন্য দল ঘোষণা করলো বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্পোর্টস ডেস্ক

শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০২:৫৩ পি.এম


ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের জন্য দল ঘোষণা করলো বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের জন্য দল ঘোষণা করেছে। দলে ফিরেছেন পেসার তাসকিন আহমেদ। ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা লিটন দাসও জায়গা পেয়েছেন। তবে সর্বশেষ আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট স্কোয়াডে থাকা সৌম্য সরকার ও সৈয়দ খালেদ আহমেদ বাদ পড়েছেন।

আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সফরে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে। বর্তমানে ক্যারিবীয়রা বিসিবি একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে অংশ নিচ্ছে। সিরিজের প্রথম টেস্ট আগামী ২৮ অক্টোবর মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হবে। ম্যাচটি সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হবে।

ঢাকা টেস্টের দলে উইকেটরক্ষক ব্যাটার জাকের আলি অনিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। পেস আক্রমণে তাসকিনের সঙ্গে রয়েছেন হাসান মাহমুদ, এবাদত হোসেন ও শরিফুল ইসলাম। স্পিন বিভাগে নাঈম হাসান, তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ রয়েছেন।

লিটন দাস সর্বশেষ ত্রিদেশীয় সিরিজে ইনজুরির কারণে দল থেকে বাদ পড়েছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাওহীদ হৃদয়। এখন টেস্ট দলে ফিরে আসছেন লিটন।

সাম্প্রতিক সময়ে জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের কাছে হতাশাজনক হারের অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে বাংলাদেশের লক্ষ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো। ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজে ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে চাইবে টাইগাররা।

ঢাকায় প্রথম টেস্ট শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট খেলতে সিলেটে যাবে দুই দল। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট আগামী ৫ থেকে ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।

ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের স্কোয়াড

নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), মো. সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান তামিম, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, লিটন কুমার দাস, তাওহীদ হৃদয়, জাকের আলী অনিক, মেহেদী হাসান মিরাজ (সহ-অধিনায়ক), তাইজুল ইসলাম, নাঈম হাসান, হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেন চৌধুরী ও শরিফুল ইসলাম।

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সরকারের বড় উদ্যোগ গ্রহণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ক্রাইম বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০২:৫৩ পি.এম


সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সরকারের বড় উদ্যোগ গ্রহণ

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব স্থাপন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং একটি স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন। পাশাপাশি, সাইবার অপরাধের মামলার তদন্তে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে জোরদার করা হচ্ছে।

সাইবার অপরাধের কারণে পারিবারিক কলহ, মানসিক বিপর্যয় এবং সামাজিক মর্যাদাহানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনলাইনে হয়রানি, হুমকি ও প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকেই মানসিক চাপ, ভয় ও হতাশায় ভুগছেন। ভুয়া আইডি খুলে মিথ্যা তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তির পাশাপাশি পরিবার ও সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সাইবার অপরাধের কারণে আর্থিক ক্ষতি, মানসিক বিপর্যয়, সামাজিক অস্থিরতা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রতারকরা অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, পাসওয়ার্ড ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করে সেগুলো প্রতারণার কাজে ব্যবহার করছে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ মন্তব্য করেন, "সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানি-সংক্রান্ত যেসব মামলা সিআইডিতে আসে, সেগুলো পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।" তিনি আরও জানান, সাইবার অপরাধ দমনে নিয়মিত নজরদারি ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সাইবার অপরাধ তদন্তে কর্মরত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এফটিআই) ও ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নতুন নতুন মডিউল যুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া, পুলিশ সদরদপ্তরের উদ্যোগে সম্প্রতি দেশব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু করা হয়েছে, যাতে সিআইডির কর্মকর্তারাও অংশ নিচ্ছেন।

সিআইডির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) ৩২টি ও সিআর (ক্রিমিনাল রেজিস্টার) ১৫৯টিসহ মোট ১৯১টি মামলা দায়ের হয়েছে। এছাড়া, সাইবার অপরাধের অভিযোগে এক বছরে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সাইবার অপরাধ দিন দিন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে ঘরে বসে খণ্ডকালীন কাজ করে আয় কিংবা ইউটিউবের ভিডিওতে ‘লাইক’ দিয়ে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে সাধারণ গৃহিণী, শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

শুরুতে এক হাজার বা দুই হাজার টাকা বোনাস দিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করা হয়। পরে বিভিন্ন ‘টাস্ক’ পূরণের নামে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করিয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত এক বছরেই এ ধরনের আর্থিক প্রতারণায় সাধারণ গ্রাহকরা শত শত কোটি টাকা হারিয়েছেন।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, "সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশ যেকোনো অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছে।" তিনি আরও বলেন, সমাজ থেকে অপরাধ দমন ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার বুলিং ও অনলাইন প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। মিথ্যা সংবাদ ও ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে সমাজে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও বিরোধ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তারা জানান, প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতার অভাব, দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার, অপরিচিত লিংক ও ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, "প্রযুক্তির জয়যাত্রার সমান্তরালে দেশজুড়ে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ।" তিনি উল্লেখ করেন, এই অপরাধের জালে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়ছেন সমাজের সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ। ওটিপি শেয়ারিং, ভুয়া ফোনকল, ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন। অনেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, আবার কেউ কেউ মৃত্যুর দিকেও ধাবিত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অচেনা কাউকে পিন বা ওটিপি দেওয়া যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশ দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে। সাইবার অপরাধ দমনে সক্ষমতা বাড়াতে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে। এ ছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) একটি ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল অপরাধের মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত রাজধানীর রমনা বিভাগে সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত ৮৮টি মামলা হয়েছে এবং ১৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লালবাগ বিভাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারী বিভাগে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিল বিভাগে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন, মিরপুর বিভাগে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশান বিভাগে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে সরকার ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে চলতি মাসে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১ অক্টোবর ঢাকায় একটি স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে। ইউনিটটিতে ৪ হাজার ৫৯২ জন পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মী রয়েছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ তদন্তের জন্য পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রয়েছে।

সম্প্রতি মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তের ওপর ১০ দিনব্যাপী বিশেষ ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স পরিচালনা করা হয়। এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁরা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন। সূত্র: বাসস

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

স্পেনে রাজকীয় আমন্ত্রণে মেসি, আজ গ্রহণ করবেন পুরস্কার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্পোর্টস ডেস্ক

শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০২:৫৪ পি.এম


স্পেনে রাজকীয় আমন্ত্রণে মেসি, আজ গ্রহণ করবেন পুরস্কার

আর্জেন্টিনার ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি স্পেনে পৌঁছেছেন ২০২৬ সালের প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কার গ্রহণের জন্য। আজ শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্পেনের ওভিয়েদো শহরের তেয়াত্রো কাম্পোয়ামোরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে ও রানি লেতিসিয়ার উপস্থিতিতে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। মেসি হচ্ছেন প্রথম ফুটবলার যিনি এককভাবে এই পুরস্কার গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।

মেসি বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে সঙ্গে নিয়ে ওভিয়েদোর ঐতিহাসিক হোটেল দে লা রেকনকিস্তায় পৌঁছান। তাঁকে স্বাগত জানাতে সেখানে অসংখ্য ভক্ত জড়ো হন। এ সময় আর্জেন্টাইন এই তারকা সমর্থকদের অটোগ্রাফ দেন।

ফুটবল ইতিহাসে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য মেসি বিশ্বকাপ জয়, আটটি ব্যালন ডি’অর এবং ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন। বার্সেলোনায় দীর্ঘ সময় কাটানোর পর ২০২১ সালে তিনি ক্লাবটি ছাড়েন এবং বর্তমানে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সাঁ-জার্মেইয়ে খেলছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন এই ফুটবলার।

২০২৬ সালের ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য মেসির নাম গত ৩ জুন প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ফাউন্ডেশনের বিচারকমণ্ডলী ঘোষণা করে। মোট ২৭টি মনোনয়নের মধ্যে তাঁকে বেছে নেওয়া হয়। বিচারকমণ্ডলী তাঁর অসাধারণ ক্রীড়া ক্যারিয়ার, ধারাবাহিক সাফল্য, বিনয়, মাঠে আদর্শ আচরণ এবং দলগত খেলার প্রতি অঙ্গীকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে তাঁর দীর্ঘদিনের দাতব্য কর্মকাণ্ডও পুরস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

১৯৮১ সালে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস পুরস্কারের যাত্রা শুরু হয়। এই পুরস্কারটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সাহিত্য, শিল্পকলা, সামাজিক বিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ক্রীড়াসহ মোট আটটি বিভাগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। পুরস্কারের সঙ্গে থাকে স্প্যানিশ শিল্পী হুয়ান মিরোর নকশা করা একটি ভাস্কর্য, সনদ, ব্যাজ এবং ৫০ হাজার ইউরো অর্থমূল্য।

এর আগে টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামস ও রাফায়েল নাদালসহ বিভিন্ন ক্রীড়াবিদ এই পুরস্কার পেয়েছেন। ফুটবলে এর আগে ২০০২ সালে ব্রাজিলের জাতীয় দল এবং ২০১০ সালে স্পেনের জাতীয় দল এই সম্মাননা অর্জন করে। ২০১২ সালে যৌথভাবে পুরস্কার পান স্পেনের দুই ফুটবলার ইকার ক্যাসিয়াস ও জাভি হার্নান্দেজ। তবে মেসির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো ফুটবলার এককভাবে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন। তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

কবি মোহাম্মদ রফিকের জন্মদিন আজ, যিনি এরশাদের শাসনে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ক্রাইম বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০২:৫৫ পি.এম


কবি মোহাম্মদ রফিকের জন্মদিন আজ, যিনি এরশাদের শাসনে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন

বাংলা কবিতার ইতিহাসে মোহাম্মদ রফিক একটি অনন্য নাম হিসেবে চিহ্নিত। তার কবিতাগুলি মানুষের অনুভূতি ও জীবনসংগ্রামের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহস ও প্রেরণা প্রদান করেছে। তার লেখা ‘খোলা কবিতা’র কিছু পঙ্‌ক্তি একসময় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে লেখা এই কবিতা শাসকের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কবিতাটি লেখার কারণে সেনাবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে।

আজ ২৩ অক্টোবর কবি মোহাম্মদ রফিকের জন্মদিন। ১৯৪৩ সালের এই দিনে বাগেরহাটের বৈটপুর গ্রামে তার জন্ম হয়। ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট ৮০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবিতা, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা বাংলা সাহিত্যে তাকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

‘সব শালা কবি হবে’—এই পঙ্‌ক্তি তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।

‘সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই,
দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।’

মোহাম্মদ রফিকের ‘খোলা কবিতা’র এই পঙ্‌ক্তিগুলো আশির দশকে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। সে সময় দেশে সামরিক শাসন চলছিল এবং ক্ষমতায় ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার শাসনামলে ছাত্র-জনতা মাঝে মাঝে আন্দোলনে ফুঁসে উঠছিল। অন্যদিকে, এরশাদ কবি হিসেবেও পরিচিতি পেতে শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে তার কবিতা।

তবে সে সময় কানাঘুষা ছিল যে, এরশাদের নামে প্রকাশিত কবিতাগুলোর সব কটির রচয়িতা তিনি নন। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল। এই পরিস্থিতিতে মোহাম্মদ রফিক কবিতার মাধ্যমে সরাসরি প্রতিবাদ জানান।

১৯৮৩ সালের জুন মাসের এক রাতে এক বসাতেই তিনি লেখেন ‘খোলা কবিতা’। ২০১৯ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবি জানান, একজন সামরিক শাসক লেখালেখির সঙ্গে আগে যুক্ত না থেকেও ক্ষমতার জোরে কবিখ্যাতি অর্জন করছেন—এ বিষয়টি তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল। তার ভাষায়, মনে হচ্ছিল, একজন ‘ভুঁইফোড় জেনারেল’ এসে তাদের কবিতার অপমান করছেন।

কবিতাটি ছাপাতে সাহস পাচ্ছিলেন না কেউ

‘খোলা কবিতা’ ছিল প্রায় ১৬ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ কবিতা। সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে লেখা হওয়ায় এটি প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তখনকার পরিস্থিতিতে কবিতাটি ছাপানোর সাহস প্রকাশকদের ছিল না।

শেষ পর্যন্ত কবির কয়েকজন ছাত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীর উদ্যোগে গোপনে ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়। ছাপাখানায় নিউজপ্রিন্টে একটি ফর্মায় ছাপানো কবিতাটি তার ছাত্রছাত্রীরা হাতে হাতে বিলি করতে থাকেন। নিষিদ্ধ ইশতেহারের মতো কবিতাটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

কবিতাটি এরশাদকে উদ্দেশ্য করে লেখা হলেও পরে মোহাম্মদ রফিক জানিয়েছিলেন, এটি শুধুমাত্র একজন শাসককে নিয়ে লেখা কবিতা নয়। তার কাছে এরশাদের সামরিক আইন জারি ছিল একটি ঘটনা। সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার জোরে কবিখ্যাতি অর্জনের প্রবণতার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

কবিতার জন্য সেনা দপ্তরে তলব

‘খোলা কবিতা’ ছড়িয়ে পড়ার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসে। একপর্যায়ে মোহাম্মদ রফিককে সাভারে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের দপ্তরে ডেকে নেওয়া হয়। এর আগে তিনি মামলা মাথায় নিয়ে তিন দিন হাজারীবাগে আত্মগোপনে ছিলেন।

সেনা দপ্তরে তিনজন কর্মকর্তার মুখোমুখি হতে হয় কবিকে। তারা প্রথমেই জানতে চান, কবিতাটি তার লেখা কি না। মোহাম্মদ রফিক নিজের লেখা বলে স্বীকার করেন। তবে কবিতাটি কে ছাপিয়েছেন, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ, প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে বিপদে ফেলতে চাননি তিনি।

তার এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, নিজের লেখা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের দায় নিতে তিনি পিছপা হননি; একই সঙ্গে সহযোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছেন।

‘খোলা কবিতা’ থেকে আন্দোলনের স্লোগান

প্রথমে গোপনে ছড়িয়ে পড়লেও পরে ‘খোলা কবিতা’ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালের অমর একুশে বইমেলায় কবিতাটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। বই করার সময় কবি কবিতাটি আরও বড় করেন। এক ফর্মার কবিতা তখন চার ফর্মার বইয়ে রূপ নেয়।

বইটি প্রকাশের কাজে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন দিলওয়ার হোসেন। তার স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি গোপীবাগের সুবর্ণ প্রিন্টার্সে রাত জেগে বইটির মুদ্রণ-প্রস্তুতির কাজ করা হয়। ছাপাখানার মালিক মজিবর রহমান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সব বাধা পেরিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি বইটি মেলায় নিয়ে আসতে পেরেছিলেন মোহাম্মদ রফিক ও দিলওয়ার হোসেন।

পরবর্তী সময়ে বইটি পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলে। ‘খোলা কবিতা’র পঙ্‌ক্তিগুলো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অনেকটা স্লোগানের মতো ব্যবহৃত হতে থাকে। একটি কবিতা কীভাবে শাসকের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে, তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে আছে এই রচনা।

ছাত্র আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ

মোহাম্মদ রফিকের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার বৈটপুর গ্রামে। তার বাবা সামছুদ্দীন আহমদ এবং মা রেশাতুন নাহার। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। শৈশব কেটেছে বাগেরহাটে।

১৯৫৮ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকার নটরডেম কলেজে ভর্তি হন। পরে ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করেন। স্নাতক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা তার সাহিত্যিক চিন্তায় প্রভাব ফেলেছিল।

কৈশোরে কৃষ্ণা নামের এক মেয়ের প্রতি ভালো লাগা থেকে অষ্টম শ্রেণিতে প্রথম কবিতা লেখেন তিনি। তবে প্রথম যৌবনে কবিতার পাশাপাশি রাজনীতিও তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এ সময় তাকে কারাগারেও যেতে হয়। সামরিক আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল বলে তার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে। পরে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য তিনি মুক্তি পান।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন মোহাম্মদ রফিক। প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের কর্মকর্তা হিসেবে এবং পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেন। দেশের স্বাধীনতা এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল।

‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ দিয়ে কাব্যজগতে যাত্রা

ষাটের দশকের শুরুতে সমকাল, কণ্ঠস্বর, স্বাক্ষর ও অচিরার মতো সাহিত্যপত্রে কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন মোহাম্মদ রফিক। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধুলার সংসারে এই মাটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে।

তার কবিতায় গ্রামবাংলার প্রকৃতি, নদী, মানুষের জীবনসংগ্রাম ও আধুনিক মননশীলতার প্রকাশ ঘটেছে। শহরের বাইরে গ্রামীণ জীবনকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার কবিতায় বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। গাওদিয়া তার বহুলপঠিত কাব্যগ্রন্থগুলোর একটি।

তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে কীর্তিনাশা, খোলা কবিতা, কপিলা, গাওদিয়া, স্বদেশী নিশ্বাস তুমিময়, মেঘে ও কাদায়, রূপকথা কিংবদন্তি, মৎস্যগন্ধা, মাতিকিসকু, বিষখালি সন্ধ্যা, কালাপানি, নোনাঝাউ, দোমাটির মুখ ও ত্রয়ী। এছাড়া তার নির্বাচিত কবিতা এবং দুই খণ্ডে মোহাম্মদ রফিক রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে।

কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লিখেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আত্মরক্ষার প্রতিবেদন, স্মৃতি বিস্মৃতির অন্তরাল, ভালোবাসার জীবনানন্দ, দূরের দেশ নয় আইওয়া, খুচরো গদ্য ছেঁড়া কথা ও গল্প সংগ্রহ।

শিক্ষকতা ও পুরস্কার

মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন মোহাম্মদ রফিক। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে যোগ দেন। দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পর ২০০৯ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন তিনি।

বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮১ সালে আলাওল পুরস্কার এবং ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ২০১০ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া তার সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছে।

২০২৩ সালের ৬ আগস্ট বরিশাল থেকে ঢাকায় ফেরার পথে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

মোহাম্মদ রফিকের জীবন ও সাহিত্যকর্মের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তিনি শুধুমাত্র কবিতার ভাষায় প্রকৃতি ও মানুষের কথা বলেননি; অন্যায় ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছেন। ‘খোলা কবিতা’ তার সেই সাহসী অবস্থানের স্মারক হয়ে আছে। তার কবিতার পঙ্‌ক্তি আজও মনে করিয়ে দেয়, সাহিত্য কখনো কখনো প্রতিবাদের শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠতে পারে।

ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ১২ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৩
জোহর ১১:৪৪
আসর ০৩:৪৯
মাগরিব ০৫:২৬
ইশা ০৬:৩৭
সূর্যোদয় : ০৫:৫৯ সূর্যাস্ত : ০৫:২৬
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%