প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ঢাকা, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর, সাইবার হামলা প্রতিরোধের জন্য বৃহস্পতিবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে। তারা সম্ভাব্য হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট পরিচালনার জন্য পিএইচপি ব্যবহার করা হয়। সরকারি সেবা, সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট এবং অনলাইন দোকানের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এ প্রোগ্রামিং ভাষার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তা ত্রুটির মধ্যে দুটি গুরুতর দুর্বলতা শনাক্ত করেছে।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তৈরি পিএইচপি নামের প্রাথমিক অর্থ ছিল ‘পার্সোনাল হোম পেজ’। বর্তমানে এর পূর্ণরূপ ‘হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর’। জনপ্রিয় ওয়েবসাইট তৈরির বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের পেছনে এ প্রোগ্রামিং ভাষা কাজ করে।
উইজের একটি ব্লগ পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পিএইচপিতে শনাক্ত হওয়া এই ত্রুটিগুলোকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতাগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এমনকি সফটওয়্যার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর ত্রুটিগুলোর মধ্যেও এগুলো স্থান পেতে পারে।’
বর্তমানে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই মডেলগুলো কম্পিউটার কোডের এমন দুর্বলতা শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে, যা বছরের পর বছর মানুষের নজর এড়িয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে শনাক্ত হওয়া সফটওয়্যার নিরাপত্তা ত্রুটির সংখ্যা গত বছরের রেকর্ডের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘ভয়াবহ ক্ষতি’ হতে পারে
পিএইচপি প্রোগ্রামাররা বুধবার নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করার জন্য সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তাদের ওয়েবসাইটের সফটওয়্যার অবিলম্বে হালনাগাদ করার নির্দেশ দিয়েছে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমগুলো ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চীন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন কর্তৃপক্ষও একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছে।
অ্যামাজন থ্রেট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশের আগেই তারা একটি হ্যাকিংয়ের চেষ্টা শনাক্ত করেছিল।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, হামলাকারী কীভাবে নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগানোর তথ্য পেয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তারা জানিয়েছে, বেনামি একটি ইন্টারনেট সংযোগ থেকে ‘হানিপট’ লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। হানিপট হলো সাইবার হামলাকারীদের কার্যকলাপ শনাক্ত করার জন্য তৈরি একটি কৃত্রিম লক্ষ্যব্যবস্থা।
তবে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফের পিএইচপি-সংক্রান্ত গবেষণায় যুক্ত রায়ান অস্টিন বিবিসিকে জানিয়েছেন, ‘এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে না যে এই ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে হামলা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।’
যেসব ওয়েবসাইট নিজস্ব সার্ভারে পিএইচপি ব্যবহার করে, সেগুলোই মূলত এ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অনেক বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অন্য প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রযুক্তি দল দ্রুত নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধন করতে পেরেছে, সেগুলোর অনেকেই অনলাইন কার্যক্রম চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের সিডনি ক্যাম্পাসের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক রাহাত মাসুদ এ আবিষ্কারকে ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি এএফপিকে বলেছেন, এ ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হামলাকারীরা কোনো অনুমতি, ব্যবহারকারীর নাম বা পাসওয়ার্ড ছাড়াই সার্ভারে প্রবেশ করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘সার্ভারে একবার ঢুকতে পারলে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো যেকোনো কাজ করতে পারে।’ এর মধ্যে সংবেদনশীল তথ্য চুরি করা কিংবা ওয়েবসাইটের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করার মতো কর্মকাণ্ডও রয়েছে।
এ ধরনের ঝুঁকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এআইয়ের সক্ষমতায় ‘নতুন যুগের সূচনা’
অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিমা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অনলাইন সেবাও জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়।
জনপ্রিয় কিছু অ্যাপও সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে পোকেমনভিত্তিক একটি ঘুম পর্যবেক্ষণকারী অ্যাপ রয়েছে। নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের কাজ চলাকালে উইকিপিডিয়া পরিচালনাকারী ফাউন্ডেশনও ব্যবহারকারীদের সম্ভাব্য সেবাবিঘ্নের বিষয়ে সতর্ক করেছে।
পিএইচপি ভাষার উন্নয়নে অর্থায়নকারী পিএইচপি ফাউন্ডেশন তাদের ব্লগ পোস্টে বলেছে, ‘আপনি যদি পিএইচপি ব্যবহার করেন, তাহলে এখনই সফটওয়্যার হালনাগাদ করা অত্যন্ত জরুরি।’
ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তা প্রকৌশলী ভলকার ডুশ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে পিএইচপি সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যার মুখে পড়েছে।
তিনি ২০১৪ সালে শনাক্ত হওয়া ‘হার্টব্লিড’ নামের নিরাপত্তা ত্রুটির সঙ্গে এর তুলনা করেছেন। ওই ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে সফটওয়্যার হালনাগাদের ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছিল।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ গত আগস্টে ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৫.৬ সল মডেল ব্যবহার করে পিএইচপির কোড নিরীক্ষার সময় ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে। ওপেনএআইয়ের অর্থায়নে পরিচালিত নিরাপত্তা নিরীক্ষার অংশ হিসেবে এ কাজ করা হয়।
ওপেনএআই বলেছে, ‘এই আবিষ্কার এমন এক নতুন পর্যায়ের সূচনা করছে, যেখানে এআই ইন্টারনেটের বিশাল পরিসরে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করতে সক্ষম।’
গুগলের মালিকানাধীন উইজ জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহ পর তাদের পক্ষ থেকেও স্বাধীনভাবে একই ত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছে। এ কাজে গুগলের জেমিনি ৪ আর্গন এবং জিপিটি-৫.৬ সলসহ একাধিক এআই মডেলের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল।
সংশোধিত সংস্করণ তৈরির জন্য ত্রুটিগুলোর বিষয়ে আগেই গোপনে পিএইচপির উন্নয়নকারীদের জানানো হয়েছিল। নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তথ্যগুলো গোপন রাখা হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন