১২:১৮ পি.এম
গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ অনুমতি নেই। ফিটনেস সনদও নেই। তবুও বছরের পর বছর ধরে শত শত ট্রলার বঙ্গোপসাগরে ছুটে যাচ্ছে। অধিকাংশ ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয়া বা জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় জেলেদের কাছে আবহাওয়ার সতর্কবার্তাও পৌঁছায় না। এর ফলে একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন জেলেরা। তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা থামছে না।
জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন শত শত মাছ ধরার ট্রলার উত্তাল বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে গভীর সমুদ্রে যাচ্ছে। কিন্তু এসব ট্রলারের একটি বড় অংশেরই নেই ফিটনেস সনদ। অনেক ট্রলারের আবার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ লাইসেন্স নেই। তবুও বছরের পর বছর ধরে এই ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম একইভাবে চলছে।
শুধুমাত্র লাইসেন্স ও ফিটনেসের অভাব নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। মাঝারি আকারের অনেক ট্রলারও গভীর সমুদ্রে চলে যাচ্ছে। অথচ অধিকাংশ ট্রলারে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয়া, জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম কিংবা আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। এর ফলে বৈরী আবহাওয়ার সময় জেলেদের জীবন রক্ষার সুযোগ খুবই কম থাকে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
প্রায়শই ঝড় বা দুর্যেগে মাছ ধরার ট্রলার দুর্ঘটনাগ্রস্ত হচ্ছে। গত এক মাসে বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের ফলে অন্তত ১০টি ট্রলার ডুবে গেছে। এতে ৫০ জনেরও বেশি জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। অনেকেই কয়েকদিন সাগরে ভেসে থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে ফিরলেও এখনো কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
৭ এবং ১৫ জুলাই কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ভেসে এসেছে দুই জেলের মরদেহ। প্রতি বছরই ট্রলারডুবির ঘটনায় বহু জেলে নিখোঁজ হন এবং যাদের অনেকের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। জেলেদের অভিযোগ, বেশি লাভের আশায় অনেক ট্রলার মালিক নির্ধারিত সীমার বাইরেও মাছ ধরতে ট্রলার পাঠান। কিন্তু সেই ঝুঁকির পুরো দায় নিতে হয় জেলেদের। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া তাদের গভীর সমুদ্রে পাঠানো হয়। নিয়মিত তদারকির অভাবে বছরের পর বছর ধরে এসব অনিয়ম চলতেই থাকে।
জেলেরা জানান, ঝড়ে অনেক ট্রলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সমুদ্রে গেলে তারা অনেক সময় হঠাৎ করেই বৈরী আবহওয়ার মুখে পড়ে। অনেক সময় আগাম কোনো সতর্ক সংকেতও পাওয়া যায় না। ঢেউ অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে গেলেই বোঝা যায় আবহাওয়া খারাপ হয়েছে। এক জেলে বলেন, 'আমরা সমুদ্রে থাকি, কিন্তু কোম্পানি আমাদের কোনো জ্যাকেট বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেয় না। বাতাস উঠলেই বুঝতে পারি বিপদ হয়েছে।'
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলেদের প্রাণহানি কমাতে আধুনিক নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ এবং দ্রুত আবহাওয়ার সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়ার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক ড. এম. লোকমান আলী বলেন, 'সরকারের উচিত জেলেদের পর্যাপ্ত নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়া এবং নিবন্ধনের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা।'
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
মৎস্য বিভাগ জানায়, ১০ থেকে ৪০ মিটার গভীরতার সামুদ্রিক এলাকায় মাছ ধরার জন্য ট্রলার পরিচালনার নির্দেশনা রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, 'যারা অনুমতিপত্র ছাড়া মাছ ধরতে যায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা তাদের আইনের আওতায় আনছি এবং অনুমতিপত্রের আওতায় আনাতেও চেষ্টা করছি।'
জেলায় মাত্র এক হাজার ট্রলারের সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতিপত্র রয়েছে। অথচ বাস্তবে ১০ হাজারের বেশি ট্রলার সাগরে যায়। কিন্তু এত বড় এই জেলে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন