০৫:০৯ পি.এম
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আপা যে পথে হেঁটেছেন, এখন আপনারাও সেই পথে হাঁটছেন। অত্যাচারীর এই পথ পালানোর পথ। এই পথে হাঁটলে মক্কায় যেতে পারবেন না, দিল্লি যেতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কোনো আধিপত্যবাদ বা বিদেশি খবরদারি মেনে নেবে না।
সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া কাজী আজহার আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। এই সমাবেশের আয়োজন করা হয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা সাইফুল্লাহ বারী এবং জামায়াতকর্মী সালাউদ্দিন হত্যার বিচার ও সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে।
এর পূর্বে জামায়াতে ইসলামীর আমির বোনারপাড়া শিমুলতাইর এলাকায় নিহত সাইফুল্লাহ বারী ও সালাউদ্দিনের কবর জিয়ারত করেন।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
সমাবেশে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আপা যাওয়ার আগে বলতেন, আমি পালাই না, অমুকের মেয়ে পালায় না। কিন্তু এখন কী হলো? পালিয়েছে।’ তিনি এও বলেন, যে পথগুলো অনুসরণ করবে, তাদেরও পালাতে হবে। তার ভাষায়, ‘এই পথের শেষ ঠিকানা দিল্লি। এ দেশের মানুষ দিল্লির খবরদারি বাংলাদেশের ওপর চায় না। কোনো আধিপত্যবাদ মানবো না।’
তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াত কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করবে না। মজবুত কদমে মাথা উঁচু করে মানুষ হিসেবে বাঁচতে চান তারা। এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘লড়াই চলছে, লড়াই চলবে। ইনশাআল্লাহ হকের বিজয় হবে, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হবে।’
ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেছেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং একটি ভাইরাসের মতো। যেখানে এটি প্রভাব বিস্তার করে, সেখানেই ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, ‘এক ফ্যাসিবাদীকে তাড়িয়ে বাংলাদেশের জনগণ আরেক ফ্যাসিবাদী চায় না। বাংলার জমিনে কোনো ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।’
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ওই সময় ভাই-বোনেরা রাস্তায় নেমেছিলেন, এমনকি ১০ মাসের শিশুসন্তান নিয়েও মায়েরা রাস্তায় নেমেছিলেন। জাতির প্রয়োজনে আবারও রাজপথে নামতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘হয়তো আবার আমাদের রাস্তায় নামতে হবে। জাতির জন্য একবার নয়, শতবার নামব ইনশাআল্লাহ,’ বলেন জামায়াত আমির।
তিনি আরও বলেন, যারা অপরাধ করে, দখল বাণিজ্য করে, নিরীহ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা নেয় অথবা মা-বোনদের ওপর নির্যাতন চালায়, তারাই প্রকৃত কাপুরুষ। এমন অপরাধী নিজের সন্তান হলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত গত ১৫ বছর মজলুম ছিল উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, মজলুমরা আবার জালিম হতে চাইবে না। সরকার গঠনের পর জামায়াতের পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
আরও পড়ুন: সদরঘাটে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানের আকস্মিক পরিদর্শন
তিনি বলেছেন, ‘আমরা কি চাই, আবার খুনের রাজত্ব কায়েম হোক? না, চাই না। তাই এখানেই ফুলস্টপ। আর সামনে খুনের দিকে পা বাড়াবেন না।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে যুবকেরা কারও চোখ রাঙানিকে ভয় পায় না।
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় উল্লেখ করে জামায়াত আমির জানিয়েছেন, ‘ক্ষমতা কারও কোমরের নিচে চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ যাঁদের সম্মান দিয়ে ক্ষমতায় বসান, তাঁদের আবার আছাড় মেরে টুকরো টুকরোও করে দিতে পারেন।’
গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ গণভোটে তাদের মতামত দিয়েছে এবং সরকারে থাকা ব্যক্তিরাও জনগণকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
তিনি বলেন, গণভোটের রায় না মানলে শুধু ক্ষমতা হারাতে হবে না, একসময় ‘নাই হয়ে যেতে হবে’। জনগণের রায় অগ্রাহ্য বা অপমান করে অতীতে কেউ টিকে থাকতে পারেনি, শান্তি ও সম্মান পায়নি এবং ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বিএনপির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা মজলুম ছিলেন। আমরা চাই আপনারা ঠিক পথে ফিরে আসুন। জনগণের সংস্কার সাধন করুন, ফ্যাসিবাদের রাস্তা বন্ধ করুন, মানবিক এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাস্তা খুলে দিন।’
এটি করা হলে বিরোধী দল হিসেবে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাসও দেন জামায়াত আমির।
বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মানুষকে বঞ্চিত না করার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, এ অঞ্চলের মানুষকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নেই। যারা বঞ্চিত করবে, তাদের ‘গণদুশমন’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল সমাজ থেকে সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা। চাঁদাবাজি ও দখলদারির সঙ্গে জড়িত হয়ে যারা মানুষ হত্যা করছে, তাদের সমাজের ‘আবর্জনা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এসব দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে প্রশাসনকে কোনো রাজনৈতিক দলের বাহিনী না হয়ে সবার জন্য কাজ করার আহ্বান জানান শফিকুর রহমান। নিহত সাইফুল্লাহ বারী ও সালাউদ্দিন হত্যার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন কারও দলীয় বাহিনী নয়। প্রশাসন এ দেশের সম্পদ। তাঁরা সবার হয়ে কাজ করবেন।’
সমাবেশে তিনি প্রশাসনের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, আসামিদের নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এ সময় তিনি পলাশ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার না করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রংপুর সফরের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রংপুরে এসে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যাতে রংপুরবাসীকে পিছিয়ে থাকার কথা বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
শফিকুর রহমানের দাবি, মির্জা ফখরুল বলেছেন, রংপুরবাসী জামায়াত ও জাতীয় পার্টিকে ভোট দেওয়ায় তারা পিছিয়ে থাকবে।
এর জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা কাকে ভোট দেব, এটা কি বিএনপি ঠিক করে দেবে? তাহলে আরও একটা আইন পাস করেন যে, আগামীতে বিএনপি ছাড়া আর কাউকে ভোট দেওয়া যাবে না। তখন জনগণ তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে ইনশাআল্লাহ।’
দেশে সব শ্রেণি-পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, তিনি এমন বাংলাদেশ দেখতে চান যেখানে শিশুরা নিরাপদ থাকবে, মেয়েরা ও মায়েরা নিরাপদ থাকবে, যুবক ও বয়স্করা নিরাপদ থাকবে।
তাঁর ভাষায়, সব ধর্মের মানুষ, সব বর্ণের মানুষ এবং সব ভাষাভাষীর মানুষকে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ দিতে হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, গাইবান্ধা সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আমির আব্দুল করিম, গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, বগুড়া জেলা জামায়াতের আমির মো. আব্দুল হক, সাঘাটা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা ইব্রাহিম হোসাইন ও সেক্রেটারি আব্দুল গফুরসহ অন্যান্য স্থানীয় নেতারা।
গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছের সভাপতিত্বে সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন