০২:৫৪ এম
ঢাকা, ২৯ জুন, ২০২৬: ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে যা চার দিনেরও বেশি সময় পরে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশাটি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। এই দুর্যোগের মধ্যে অন্তত এক হাজার ৪৫০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় বাসিন্দাদের মধ্যে সরকার সম্পর্কে অসন্তোষ বাড়ছে।
এএফপি’র সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, রোববার কারাবালেদা শহরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা এক ব্যক্তি এবং তার কিশোর ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করেন। উল্লেখ্য, এই শহরটি রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
লা গুয়াইরা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ সংবাদটি নিশ্চিত করেছে। এই উদ্ধার অভিযানটি কিছুটা আশার সূচনা করলেও, দেশটি এখনো গভীর মানবিক সংকটের শিকার।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ভেনেজুয়েলায় এই ভূমিকম্পটি নতুন এক বিপর্যয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আটকা পড়াদের উদ্ধারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা ইতিমধ্যেই অতিক্রম করলেও, এখনো বহু মানুষের সন্ধান মেলেনি। এছাড়া, আরও কয়েক মিলিয়ন মানুষ মৌলিক সেবার বাইরে রয়েছে, বিশেষ করে স্যানিটেশন সমস্যা। এটি ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্পে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রড্রিগেজ রোববার জানান, বুধবার সন্ধ্যায় ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি ভূমিকম্পে ৭৭৪টি ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৯টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
উপকূলীয় শহর তুকাকাসে ধসে পড়া একটি ভবনের স্তূপের নিচে আটকে পড়াদের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ২৭ বছর বয়সী লুইস সালাস এএফপিকে বলেছেন, ‘সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত ছিল, যখন আমরা সুড়ঙ্গের ভেতরে আশার আলো দেখেছি। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়েছি, ধ্বংসস্তূপ সরিয়েছি, সর্বশক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু নির্ধারিত স্থান পৌঁছে তাদের মৃত অবস্থায় পেয়েছি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাই জীবিতদের উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর পর সাধারণত উদ্ধার অভিযান মৃতদেহ উদ্ধারে রূপ নেয়।
রাজধানী কারাকাসের সান বার্নারদিনো এলাকায় স্বেচ্ছাসেবীরা ধসে পড়া একটি ভবনের ওপর উঠে ড্রিল মেশিন দিয়ে কংক্রিট ভাঙছেন। এ সময় তারা সারিবদ্ধভাবে হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন।
কারাকাসের আরেক এলাকায় চাকাওয়ে সাধারণত বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহৃত একটি ভবনের বড় বড় ইলেকট্রনিক পর্দায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
রোববার হোর্হে রড্রিগেজ জানিয়েছেন, মৃতের সংখ্যা বেড়ে এখন এক হাজার ৪৫০ জনে পৌঁছেছে। এবং এটি আরও বাড়তে পারে। সেইসাথে অন্তত তিন হাজার ১৫০ জন আহত হয়েছেন।
-‘একা পারছি না’-
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা লা গুয়িরার উপকূলীয় শহরে একটি পরিবারের চার সদস্যকে খুঁজতে এসেছেন হেক্টর আগুইলার। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের সদস্যদের বের করে আনার মতো কোনো সহায়তা পাচ্ছি না। একা এটা সম্ভব নয়। তারা ওখানেই চাপা পড়ে আছেন। আমরা জানি যে তারা মারা গেছেন। তবুও আমরা এখানে আছি।’
উদ্ধার অভিযান চলমান থাকলেও কিছু এলাকায় জনঅসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুকাকাসের স্বেচ্ছাসেবক এডুয়ার্ডো কার্ডোজো মন্তব্য করেন, যদি সময়মতো তল্লাশি পরিচালনা করা হতো, তাহলে কিছু মানুষ বাঁচানো যেত।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ৪, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৫১ জন
লা গুয়িরা অঙ্গরাজ্যের তানাগুয়ারেনা এলাকায় একজন ব্যক্তি সেনাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘দেশের আপনাদের দরকার। অস্ত্র নামিয়ে কোদাল-শাবল হাতে নিন।’
লা গুয়িরা শহরে লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। শহরের বড় অংশ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, ফার্মেসি এবং সুপারমার্কেট সহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট হয়েছে।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, ভূমিকম্প-পরবর্তী সরকারি সহায়তা অত্যন্ত ধীরগতিতে এবং অপ্রতুল।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে ৫ বিষয়ে অগ্রাধিকার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ রোববার জানান, যাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে, তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়শিবির নির্মাণ করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘একই সাথে এমন প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নতুন বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব হবে।’
-অর্থনৈতিক প্রভাব-
রড্রিগেজ রোববার উদ্ধারকর্মীদের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমরা এখনো জীবিত মানুষ উদ্ধার করছি। সুতরাং এই প্রচেষ্টা বন্ধ করা হবে না।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা সবসময় আশা আঁকড়ে ধরে থাকি।’
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আতঙ্ক, তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
স্বেচ্ছাসেবক কার্ডোজোও আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও অপেক্ষা করছি। দেখা যাক, আর কাউকে উদ্ধার করা যায় কি না।’
রদ্রিগেজ জানান, ২৪টি দেশ থেকে ৫২১ টন ত্রাণসামগ্রী এসেছে। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষ শনাক্তের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরসহ ৮৬টি ইউনিট ও দুই হাজার ৭০০ জনেরও বেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকর্মী পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড জানায়, মার্কিন হেলিকপ্টার দ্বারা ত্রাণসামগ্রী আনা হয়েছে। বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে আরও ২৩০ জন মার্কিন সামরিক সদস্য সহায়তায় আসছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কারাকাসে সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে দেশে ২৫০ সদস্যের একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠিয়েছে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানায়, জনসংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাদের আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি ত্রাণসামের প্রয়োজন হবে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভূমিকম্পটি এমন সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন তেলসমৃদ্ধ দেশটি এক দশকের বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটির হাসপাতাল ও জনসেবামূলক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ কারণে কয়েক লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এ ভূমিকম্পে ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ভেনেজুয়েলার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ছয় শতাংশের সমান।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
