০৯:৩১ পি.এম
কিছু মিনিটের মধ্যে সবকিছু পালটে যায়। কেউ প্রাণ রক্ষার জন্য পাহাড়ে দৌড়ান, কেউ বনমুখী হন। আবার কেউ বন্যার তীব্র স্রোতের আগে গাড়ি চালিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। একজন জীবন বাঁচাতে বিদ্যুতের তারের ওপর আঁকড়ে ধরেছিলেন। প্রাণে ফিরলেও তাঁদের মনে এখনো ঘরবাড়ি, বসতি ও প্রিয়জনদের হারানোর ভয়াবহ স্মৃতি তাড়া করে।
গত বুধবার সকালে নেপালের ভোতেকোশী নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন অনেকে। মুহূর্তের মধ্যে পানির স্রোতে ভেসে যায় বিশাল এলাকা। ধ্বংস হয়ে যায় বসতি, প্রাণ হারান মানুষ। নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট সাতজন বেঁচে ফেরা মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে।
বিদ্যুতের তার আঁকড়ে বাঁচলেন রামবাচন
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
৩৬ বছর বয়সী রামবাচন সাহ প্রায় ১৫ বছর ধরে সেতুর কাছে শ্যাম মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন। বুধবার সকালে দোকানে মিষ্টি তৈরির সময় হঠাৎ বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ার সময় একটি বিদ্যুতের তার তাঁর হাতে আটকে যায়।
প্রায় আধা ঘণ্টা সেই তার আঁকড়ে ঝুলে থেকে প্রাণে বাঁচেন তিনি। রামবাচন বলেন, "নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় না দেখে তিনি তারটি ধরে ফেলেছিলেন। হাত ফসকে গেলে তার বেঁচে ফেরার কোনো সুযোগ ছিল না।"
তবে প্রাণে বাঁচলেও তার সঙ্গে থাকা তিনজন সঙ্গীতা, তার ছেলে রাহুল ও আরেক কর্মী বিনোদ ভগত এখনো নিখোঁজ।
স্বজনদের হারিয়ে বেঁচে আছেন সচিন
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আতঙ্ক, তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
বন্যার সময় ঘটনাস্থলে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান সচিন খাতি। তবে তাঁর মামা রাজ কুমার দিয়ালি, মামি শ্রিতি এবং তাঁদের চার বছরের ছেলে শ্রীরাজ এখনো নিখোঁজ।
রাজ কুমার দীর্ঘদিন ধরে রাসুয়ার স্যাব্রুবেশি-৫ এলাকায় গয়নার ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন। সচিনও তাঁদের সঙ্গে থেকে ব্যবসায় সহযোগিতা করছিলেন।
বুধবার সকালে কাজের জন্য সচিনকে চিলিমেতে পাঠিয়েছিলেন রাজ কুমার। বন্যার খবর পেয়ে ফিরে এসে তিনি দেখেন, তাঁদের পুরো বসতিই স্রোতে ভেসে গেছে।
বর্তমানে নেপালি সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় ধুনচেতে রয়েছেন সচিন। তার স্বজনেরা এখনো নিখোঁজ তিনজনের সন্ধানের অপেক্ষায়।
আরও পড়ুন: বিলবোর্ডের ছবিকে রাস্তা ভেবে সজোরে ট্রাক চালালেন চালক, অতঃপর প্রাণ হারালেন
বন্যার স্রোতের আগে গাড়ি চালিয়ে পালালেন রাজ কুমার কার্কি। বন্যার ভয়াবহ স্রোতের সামনে থেকে গাড়ি চালিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন রাজ কুমার কার্কি। মঙ্গলবার নুয়াকোটের বেত্রাবতিতে পৌঁছেছিলেন তিনি। পরদিন সকালে পণ্য নিতে তিমুরের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই মাইকে বন্যার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। কার্কি দ্রুত কনটেইনার ট্রাক ঘুরিয়ে গালছির দিকে যেতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরই দেখতে পান বিশাল পানির স্রোত তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে।
তিনি গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন। তার সামনে থাকা কয়েকটি গাড়ি ও চালক স্রোতে ভেসে যায়। পেছনে থাকা প্রায় নয়টি কনটেইনার ট্রাকও বন্যার পানিতে হারিয়ে যায়।
সাইড মিররে পেছনে ধেয়ে আসা পানি দেখতে দেখতে কার্কি ত্রিশূলীর ধুংগে বাজারের কাছে ট্রাকটি পাহাড়ের দিকে তুলে দেন। এতে প্রাণের পাশাপাশি তাঁর ট্রাকটিও রক্ষা পায়।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে
পরে পাহাড়ের ওপর থেকে নিজের পরিচিত বসতি ও মানুষদের ধ্বংস হতে দেখেন তিনি।
পাহাড়ে দৌড়ে উঠে বাঁচলেন গাথে কামি
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে কাজ করছিলেন সাল্যানের ৪০ বছর বয়সী গাথে কামি। বুধবার সকালে পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো শব্দ শুনে তিনি বুঝতে পারেন বিপদ আসছে।
এরপর ভোতেকোশী নদীর পানি ভয়াবহ গতিতে এগিয়ে আসতে দেখে সবাইকে দৌড়াতে বলেন কামি। নিজেও প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু বনাঞ্চলের দিকে ছুটে যান।
আরও পড়ুন: লাইভ সম্প্রচারে প্রার্থনার সময় ক্রুশ পড়ে যাজক পাত্রিসিও আলফ্রেডো সানচেজ মোলিনারির মৃত্যু
দৌড়ানোর একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পর দেখেন, নিচের বসতি ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষের চিৎকার আর ছোটাছুটির দৃশ্য এখনো তাঁর চোখে ভাসে।
কামির ভাষায়, "পুরো ঘটনাটি এখনো তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। শৈশবে পাহাড়ে গরু-ছাগল চরানোর সময় খাড়া পাহাড়ে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতাই সেদিন তাকে বাঁচতে সাহায্য করেছে।"
বনের দিকে দৌড়ে প্রাণে বাঁচেন রাজু
তিমুরেতে নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কাস্টমস এজেন্ট রাজু বুধাথোকি। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ পাহাড় কাঁপতে শুরু করলে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্কে সিটিবাইক পরিষেবা ৭ নতুন এলাকায় সম্প্রসারিত, ২৩৪টি স্টেশন যুক্ত
রাজু জানান, "পুরো পাহাড় এমনভাবে কাঁপছিল যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। কী ঘটছে তা বোঝার আগেই জীবন বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দেন তিনি।"
পুলিশ পোস্টের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও দেখেন, পুলিশ সদস্যরাও নিরাপদ স্থানে পালাচ্ছেন। পেছনে তাকিয়ে দেখতে পান, তিমুরের ঘরবাড়ি একের পর এক পানিতে ভেঙে পড়ছে।
শেষ পর্যন্ত বসতি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু বনের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নেন তিনি। সেখান থেকেই দেখেন, পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
‘নতুন জীবন’ নিয়ে ফিরলেন প্রকাশ গৌতম
কাঠমান্ডুর গোকর্ণেশ্বরের বাসিন্দা প্রকাশ গৌতমও বুধবার তিমুরেতে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো বসতি কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে যায় চারপাশ, আকাশ ঢেকে যায় কালো মেঘে।
কোথায় যাবেন বুঝতে না পেরে জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে শুরু করেন গৌতম। পালানোর সময় বাঁ পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে আঘাত পান। পরে বনের মধ্যে উঠে সেখান থেকে দেখতে পান, বন্যার পানিতে মানুষের মরদেহ ভেসে যাচ্ছে এবং তিমুরের পুরো বসতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে তাঁদের বিদুরে নিয়ে যাওয়া হয়। হেলিকপ্টারে ওঠার পরই গৌতম বুঝতে পারেন, এবার হয়তো তিনি সত্যিই বেঁচে ফিরতে পারবেন।
তার ভাষায়, "তিনি যেন নতুন জীবন নিয়ে ফিরে এসেছেন।"
বন্যার ঢেউয়েই প্রাণ বাঁচল তুলসীর
রাসুয়ার একটি বসতিতে ছিলেন তুলসী বাহাদুর ভান্ডারি। হঠাৎ কালো কাদা ও পানির ভয়াবহ স্রোত বসতির ওপর দিয়ে বয়ে যেতে শুরু করে। একপর্যায়ে একটি শক্তিশালী ঢেউ তাকে ছুড়ে ফেলে পাহাড়ের দিকে।
তুলসী বাহাদুর জানান, "ভবনগুলো মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ছিল। কীভাবে কোথা থেকে ওই ভয়াবহ স্রোত এলো, তা বোঝারও সুযোগ পাননি তিনি।"
দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও পানির স্রোত তাকে ধরে ফেলে। পরে একটি ঢেউ প্রচণ্ড আঘাত করে তাঁকে পাশের পাহাড়ের দিকে ছুড়ে দেয়। তাঁর ধারণা, ওই ঢেউ তাঁকে পাহাড়ের দিকে না ছুড়ে দিলে আজ তিনি বেঁচে থাকতেন না।
বেঁচে ফিরলেও কাটছে না ভয়
ভোতেকোশীর ভয়াবহ বন্যা থেকে সাতজন প্রাণে বাঁচলেও তাদের জন্য নতুন লড়াই শুরু হয়েছে। একদিকে বেঁচে ফেরার স্বস্তি, অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনা এবং চোখের সামনে দেখা ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি।
কেউ বিদ্যুতের তার আঁকড়ে, কেউ পাহাড়ে উঠে, কেউ বনের দিকে ছুটে কিংবা কেউ বন্যার স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে প্রাণে ফিরেছেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের সেই ভয়াবহতা তাঁদের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে যে সময়ে চোখের সামনে ঘরবাড়ি, বসতি ও পরিচিত মানুষগুলো হারিয়ে গেছে ভয়ংকর স্রোতে।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন