০৮:১২ পি.এম
জুলাই মাসের যোদ্ধা মোহাম্মদ ইসমাইল। আন্দোলনের তীব্র সময়ে যখন তার ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায়, তখন মা ছিলেন দিশেহারা। হঠাৎ করে ফোনে খবর আসে, তার ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা। উদ্বিগ্ন মা দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। জরুরি বিভাগে খুঁজে না পেয়ে তিনি মর্গে চলে যান। সারি সারি নিথর দেহের ভিড়ে মুখ দেখে চেনার উপায় ছিল না। অবশেষে পরনের পোশাক দেখে তিনি চিনতে পারেন নিজের সন্তানকে। মাথায় গুলির ক্ষত নিয়ে পড়ে আছেন ইসমাইল। ছেলেকে হারানোর সেই বেদনার কথা বলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন মা তাসলিমা আক্তার।
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় সোমবার (১২ অক্টোবর)। ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তাসলিমার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তিনি ছিলেন দশম সাক্ষী। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। এই মামলায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ মোট আসামি ২৮ জন।
৩০ বছর বয়সী তাসলিমার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায়। বর্তমানে তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বসবাস করছেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তার ছেলে ইসমাইল নিহত হন।
আরও পড়ুন: জলবায়ু ও উন্নয়ন কাজে তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার চায় বাংলাদেশ
তাসলিমা বলেন, ‘১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল ৩টায় বাসা থেকে বের হয়ে আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে আন্দোলনে যোগ দেয় ইসমাইল। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আমাকে ফোন করে ছেলের বন্ধু মনির। ইসমাইলকে আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে দেখেছে বলে জানায় সে। তাকে বাসায় ফিরে আসতেও বলা হয়।’
বাসায় ফিরে না এসে আন্দোলনে থেকে যান ইসমাইল। তবে টাকা না থাকায় ছেলেকে ফোন করতে পারেননি মা। পরে তাকে ফোন দেন খালা আকলিমা। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। কয়েকবার চেষ্টা করার পর ফোন ধরেন তার বন্ধু কালু।
ইসমাইলের মা বলেন, কালু ফোন ধরে বলেন, ‘ইসমাইল আপনার কে হয়?’ আমার বোন বলেন, ‘আমি ইসমাইলের খালা।’ তখন কালু বলেন, ‘ইসমাইল গুলি খাইছে। তাকে আমরা ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।’ খবর শুনে ঢাকা উদ্যান থেকে রিকশা নিয়ে আমি, মা-বোনসহ ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশে রওনা দিই। কিছু দূর যাওয়ার পর রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখি। কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তাপস ও বিপ্লবদের হাতে অস্ত্র ছিল। আমার সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তিনি বলেন, আমরা রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পৌঁছাই। প্রথমে জরুরি বিভাগে যাই। সেখানে গুলি খাওয়া বহু লোককে জীবিত ও মৃত অবস্থায় দেখতে পাই। আমরা প্রতি তলায় ছেলেকে খুঁজতে থাকি। এরপর এক ডাক্তারকে বললে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। আমি বলি, এখানে আমার ছেলে নেই। কিছুক্ষণ পর তিনি মোবাইলে ছবি দেখান। ছবি দেখে আমি ছেলেকে শনাক্ত করি। ছেলে কোথায় আছে জিজ্ঞেস করলে আমাকে মর্গে নিয়ে যান ওই চিকিৎসক। মর্গে গিয়ে দেখি ৩০০-৪০০ মরদেহ। একটার ওপর একটা পড়ে আছে। পরনের পোশাক দেখে আমি ছেলেকে চিনতে পারি।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গ্রাহক ফখরুল ইসলাম সোহেলের মামলা
সাক্ষী বলেন, ইসমাইলের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ছেলের লাশ চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, লাশ দেওয়া যাবে না। যার যার থানার ওসি এলে লাশ দেবেন। পরদিন বেলা ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা থেকে সাইফুল দারোগা হাসপাতালে আসেন। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় ইসমাইলের লাশ পেয়ে বাসায় নিয়ে আসি। হাসপাতাল থেকে মামলা করবো না জানিয়ে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ছাতা মসজিদে আমার ছেলেকে গোসল দিয়ে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ সময় ছেলেকে হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, রাসেল, মোল্লা রুবেল, কমিশনার আসিফের পিএস বিপ্লব, বিপ্লব কুমার, সৈকত, সাজ্জাদ পলাশ, সাত্তার, মোহাম্মদ ইসমাইল, রাষ্ট্রন, রওশনসহ আরও অনেককেই দায়ী করেন তাসলিমা। তবে জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। একই সঙ্গে ইসমাইল হত্যার বিচার চান এই মা।
এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন চার আসামি। তারা হলেন— নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক এবং যুবলীগকর্মী ফজলে রাব্বি। বাকিরা পলাতক রয়েছেন।
আরও পড়ুন: ফ্লোরিডার মহাসড়কে পাঁচ গাড়ির সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তার সন্তান নিহত
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন